যুক্তরাষ্ট্র ‘পাতানো যুদ্ধ’ করছে বলে অভিযোগ তুলেছেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। তিনি বলেন, ‘তারা (যুক্তরাষ্ট্র) বলেছিল আর কখনো যুদ্ধ করবে না, অথচ এখন নিজেরাই যুদ্ধ বানাচ্ছে।’
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে থাকা বিশ্বের সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডকে ভূমধ্যসাগর থেকে সরিয়ে ভেনেজুয়েলার কাছাকাছি ক্যারিবিয়ান সাগরের দিকে পাঠানোর নির্দেশ দেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। জাহাজটিতে প্রায় ৯০টি যুদ্ধবিমান বহনের সক্ষমতা রয়েছে। এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবিয় অঞ্চলে বিশাল সামরিক শক্তি মোতায়েন করছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে খবর চাওর হয়।
এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় সময় শুক্রবার ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্যারিবিয় অঞ্চলে যুদ্ধ সাজানোর অভিযোগ তোলেন মাদুরো। তিনি বলেন, ‘এটা যুদ্ধ নয়, বরং একটি রাজনৈতিক নাটক। আমার সরকারকে ভেতর থেকে দুর্বল করার জন্য এই যুদ্ধের নাটক তৈরি করা হচ্ছে।’
তবে ওয়াশিংটনের দাবি, এই সামরিক তৎপরতা কেবল ‘মাদক চোরাচালান’ দমনের উদ্দেশ্যে। পেন্টাগনের পক্ষ থেকে বলা হয়, এই অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের সাউদার্ন কমান্ডের আওতায় পড়বে, যা মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং ক্যারিবিয় অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করে। পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল জানান, অতিরিক্ত এই বাহিনী ‘মাদক চোরাচালান দমন ও আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র দুর্বল করতে সহায়তা করবে।’

তবে জেরাল্ড আর ফোর্ডের মোতায়েনকে বিশ্লেষকরা বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা বলে মনে করছেন। জাহাজটি যুদ্ধবিমানের সাহায্যে আকাশ থেকে হামলার সক্ষমতা রাখে এবং প্রয়োজনে ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ডেস্ট্রয়ার জাহাজসহ আক্রমণ দল তৈরি করে লক্ষ্যকে নিষ্ক্রিয় করতে পারে।
সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে ক্যারিবিয় অঞ্চলে যুদ্ধজাহাজ, পারমাণবিক সাবমেরিন ও এফ-থ্রি ফাইভ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সেই সঙ্গে সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে ক্যারিবিয়ান সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক বিরোধী অভিযানে অন্তত ১০টি বিমান হামলা চালিয়েছে পেন্টাগন। এসব হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৪৩ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস।
শুক্রবার এমনি এক অভিযানে ছয়জন ‘মাদক-সন্ত্রাসী’ নিহত হয়েছে বলে জানান পিট হেগসেথ। তার দাবি, ওই নৌযানটির মালিক ভেনেজুয়েলার অপরাধচক্র ‘ট্রেন দে আরাগুয়া’।
ক্যারিবিয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক বিমান হামলায় উদ্বেগ জানিয়েছে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানের দাবিতে আন্তর্জাতিক সমুদ্র সীমানায় হামলাগুলোর বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। আর কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প বরাবরই মাদুরো বিরোধী। এটি সরকারকে ‘ভয়’ দেখিয়ে ভেনেজুয়েলা অস্থিতিশীল করার এক পরিকল্পিত প্রচেষ্টামাত্র। তিনি বহুবার প্রকাশ্যে ভেনেজুয়েলার সরকারের সমালোচনা করেছেন। এমনকি মাদুরোর প্রধান বিরোধী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকেও তিনি প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছেন।

লন্ডনের থিঙ্ক ট্যাংক চ্যাথাম হাউসের লাতিন আমেরিকা বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টোফার সাবাতিনি বলেন, ‘এটা আসলে সংকেত দেওয়ার কৌশল। তারা চায় ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনী ও মাদুরোর ঘনিষ্ঠরা ভয় পাক এবং ভেতর থেকেই মাদুরোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সরকার উচ্ছেদে ভূমিকা রাখুক।’
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের কিছু সদস্যও হামলাগুলোর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের অনেক সেনেটরের অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই এসব হামলার নির্দেশ দিয়েছেন। মার্কিন সংবিধানের প্রথম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। সেনেটররা বলছেন, এই ক্ষমতা কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই এখন হোয়াইট হাউস ‘দখল করে নিয়েছে’।
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলছেন, তিনি আইন মেনেই এসব হামলার অনুমতি দিয়েছেন।


