টাইমসে প্রকাশিত সংবাদে চসিক মেয়রের প্রতিবাদ ও প্রতিবেদকের বক্তব্য

টাইমসে প্রকাশিত সংবাদে চসিক মেয়রের প্রতিবাদ ও প্রতিবেদকের বক্তব্য
ছবি কোলাজ: টাইমস
Advertisement
Advertisement

‘মেয়াদোত্তীর্ণ মেয়রের ক্ষমতার দাপট’ শিরোনামে টাইমস অব বাংলাদেশে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র শাহাদাত হোসেন।

এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘গত ৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে টাইমস অব বাংলাদেশ সংবাদপত্রের বাংলা সংস্করণে প্রকাশিত সংবাদে আমাকে জড়িয়ে যেসব অভিযোগ ও মন্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে, তার প্রতিবাদ জানাচ্ছি। সংবাদটির শিরোনাম, উপস্থাপনা ও বিভিন্ন বক্তব্যের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ধারণা সৃষ্টি করা হয়েছে।’

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘সংবাদে নগর ভবনে পুলিশের অভিযান এবং সেখানে ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগার উপস্থিতির বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন তাকে আমার কার্যালয়ে পাওয়া গিয়েছিল এবং আমি তাকে পুলিশের হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছি। অথচ সংবাদে এমন কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়নি, যা দিয়ে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে বগাকে আমার কার্যালয়ে পাওয়া গিয়েছিল। বরং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) আমিনুর রশীদের বক্তব্য অনুযায়ী, বগা টাইগারপাস এলাকায় আছে—এমন গোপন তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ সেখানে ও আশপাশের রাস্তায় অবস্থান নিয়েছিল। তার বক্তব্যেই বলা হয়েছে, বগা আগেই সরে যাওয়ায় তাকে আটক করা সম্ভব হয়নি।’

‘দ্বিতীয়ত, সংবাদে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) ফয়সাল আহমেদের বক্তব্যও প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, নগর ভবনে পুলিশের অভিযান হয়নি এবং পুলিশের কাজে কেউ বাধাও দেয়নি। পুলিশের এই বক্তব্যের সঙ্গে সংবাদটির শিরোনাম ও মূল উপস্থাপনার অসংগতির বিষয়টি পাঠকের বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বক্তব্যে যেখানে নগর ভবনে অভিযান ও বাধা দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করা হয়েছে, সেখানে আমাকে পুলিশি অভিযানে বাধাদানকারী হিসেবে চিত্রিত করার ভিত্তি কী—সেই প্রশ্নের জবাব সংবাদটিতে স্পষ্ট নয়’, যোগ করেন তিনি।

মেয়র শাহাদাত আরও বলেন, ‘সংবাদে আমার বক্তব্য উদ্ধৃত করা হলেও সেই বক্তব্যের মূল প্রেক্ষাপট যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। আমি স্পষ্টভাবে জানিয়েছি, বগার দুই ভাই তাদের বিরুদ্ধে মামলা ও হয়রানির অভিযোগ নিয়ে আমার কাছে এসেছিলেন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে কারও অভিযোগ শোনা মানেই তাকে আশ্রয় দেওয়া, তার অপরাধের পৃষ্ঠপোষকতা করা কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজে বাধা দেওয়া নয়। অভিযোগ শোনা এবং অপরাধে সহযোগিতা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। অথচ একটি অভিযোগ শোনার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমার সঙ্গে কথিত শীর্ষ সন্ত্রাসীর সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।’

বগার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে কি না, তার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ রয়েছে কিংবা তিনি কোনো অপরাধে জড়িত কি না—এসব তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া নির্ধারণ করবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তাই বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকার কারণে তার পরিবারের কোনো সদস্য আমার কাছে অভিযোগ জানাতে পারবেন না, এমন নয়। একজন জনপ্রতিনিধির কাছে নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ থাকা স্বাভাবিক। সেই সুযোগকে অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা অনুচিত।’

চসিক মেয়রের অভিযোগ, খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুর রহিমের বদলির বিষয়টিও সংবাদে তার বক্তব্যের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত করা হয়েছে, যেন তার ক্ষোভ প্রকাশের কারণেই ওসির বদলি হয়েছে। শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘অথচ সংবাদে উদ্ধৃত অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ফয়সাল আহমেদ বদলিটিকে নিয়মিত প্রশাসনিক বদলি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কোনো কর্মকর্তার বদলির সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক বিষয়। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া এ সিদ্ধান্তের জন্য আমাকে দায়ী করা এবং আমার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তোলা গ্রহণযোগ্য নয়।’

‘সংবাদে কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তির বক্তব্যের মাধ্যমে আমাকে “সন্ত্রাসীদের গডফাদার” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ ধরনের গুরুতর অভিযোগ কোনো প্রমাণিত তথ্য নয়, এগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রাজনৈতিক বক্তব্য ও মূল্যায়ন। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, সমালোচনাও হতে পারে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া একজন জনপ্রতিনিধিকে অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উপস্থাপন করা দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়’, যোগ করেন তিনি।

চসিক মেয়রের মেয়াদের বিষয়েও সংবাদে ‘মেয়াদোত্তীর্ণ’ শব্দটি ব্যবহার করে একটি আইনগত বিষয়কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মতো উপস্থাপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। বলেন, ‘আমি আদালতের রায়ের ভিত্তিতে মেয়রের দায়িত্ব পালন করছি। আমার অবস্থান অনুযায়ী, আদালতের রায় অনুসারে আমার মেয়াদ ২০২৯ সালের ৩ নভেম্বর পর্যন্ত বহাল রয়েছে। এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে আদালতের রায় ও প্রাসঙ্গিক আইনের ভিত্তিতে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা হওয়া উচিত। আইনগত বিষয়কে একতরফাভাবে উপস্থাপন করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা সমীচীন নয়।’

আরও পড়ুন

‘আমি চট্টগ্রাম নগরীর মানুষের কল্যাণে ও নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হোক। কিন্তু অনুমান, রাজনৈতিক বক্তব্য ও অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে আমাকে অপরাধের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে চিত্রিত করা হলে তা আমার ব্যক্তিগত ও সামাজিক মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে এবং জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে’, ক্ষোভ জানান শাহাদাত হোসেন।

তিনি টাইমস অব বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে প্রকাশিত সংবাদটির শিরোনাম ও উপস্থাপনা পুনর্বিবেচনা, তথ্যগত অসংগতি সংশোধন এবং এই প্রতিবাদলিপি যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশের আহ্বান জানান।  

প্রতিবেদকের বক্তব্য

এ বিষয়ে নিজের অবস্থান ও প্রতিবেদনের ব্যখ্যা দিয়েছেন টাইমস অব বাংলাদেশের প্রতিবেদক।

তিনি বলেন, গত ৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে টাইমস অব বাংলাদেশের বাংলা সংস্করণে প্রকাশিত ‘মেয়াদোত্তীর্ণ’ মেয়রের ক্ষমতার দাপট শীর্ষক প্রতিবেদনটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, পুলিশের বক্তব্য এবং ঘটনাপ্রবাহের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবেদনটির উদ্দেশ্য ছিল চট্টগ্রাম নগর ভবনে ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্ক, খুলশী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রহিমের বদলি এবং এ ঘটনায় বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়া তুলে ধরা।

মেয়র শাহাদাত হোসেন তার প্রতিবাদলিপিতে দাবি করেছেন, নগর ভবনে বগার উপস্থিতি কিংবা তাকে পুলিশের হাত থেকে রক্ষার চেষ্টার বিষয়ে প্রতিবেদনে প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেওয়া হয়নি। বগার দুই ভাই মামলা ও হয়রানির অভিযোগ জানাতে তার কাছে এসেছিলেন। কারও অভিযোগ শোনা অপরাধে সহযোগিতা বা পৃষ্ঠপোষকতার প্রমাণ নয়।

সংবাদে প্রশ্ন তোলা হয়েছে ঘটনাপ্রবাহ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে, সাক্ষাতকে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে নয়।

তবে প্রতিবেদনটির মূল বিষয় শুধু মেয়রের কাছে বগার ভাইদের আসা নয়; বরং বগাকে ঘিরে পুলিশের একাধিক মামলা, তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টায় সংঘর্ষ, ওসির বিরুদ্ধে হুমকির অভিযোগ এবং এর পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই মেয়রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্কের বিষয়টি প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। বগার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলোকে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখানোও প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য ছিল না।

ওসি আব্দুর রহিমের বদলির বিষয়ে মেয়র বলেছেন, এটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। প্রতিবেদনে সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ফয়সাল আহমেদের বক্তব্যও উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে তিনি বদলিটিকে নিয়মিত প্রশাসনিক বদলি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

তবে মেয়রের প্রকাশ্য বক্তব্যের প্রায় দুই ঘণ্টার মধ্যে বদলির ঘটনা ঘটায় এ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ঘটনাক্রমের এই দিকটি সংবাদে তুলে ধরা হয়েছে; বদলির সিদ্ধান্ত মেয়রের নির্দেশে হয়েছে- এমন কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়নি। বদলির প্রকৃত কারণ নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

প্রতিবেদনে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বক্তব্যের মাধ্যমে মেয়রকে ‘সন্ত্রাসীদের গডফাদার’ বলার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বক্তব্য, প্রতিবেদকের নিজস্ব সিদ্ধান্ত বা আদালতে প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।

মেয়রের মেয়াদের বিষয়েও প্রতিবেদনে ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে পাঁচ বছর হিসাব করে ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মেয়াদ শেষ হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মেয়র আদালতের রায়ের ভিত্তিতে ২০২৯ সালের ৩ নভেম্বর পর্যন্ত দায়িত্বে থাকার দাবি করেছেন, সেটিও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। আদালতের রায়ে তার মেয়াদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা কী রয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট নথি ও আইনগত ব্যাখ্যার ভিত্তিতে আরও যাচাই ও পর্যালোচনার বিষয়। এ বিষয়ে কোনো পক্ষের বক্তব্যকে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখানো প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য ছিল না।

প্রতিবেদক বলেন, ‘প্রকাশিত সংবাদটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, ঘটনাকে কেন্দ্র করে হেনস্তার শিকার সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলে তৈরি করা হয়েছে। সংবাদে অনুমান, রাজনৈতিক বক্তব্য, অসম্পুর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে বলে মেয়র যে দাবি করেছেন, তা সত্য নয়। আমরা প্রকাশিত সংবাদের সকল তথ্যের পক্ষেই অবস্থান করছি।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad