দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর দাবির মধ্যে এক ধরনের ভারসাম্য বজায় রেখে প্রধান উপদেষ্টা ঘোষণা দিয়েছেন যে, জুলাই সনদের ওপর গণভোট আগামী সংসদ নির্বাচনের দিনেই অনুষ্ঠিত ঘোষণা অনুযায়ী, প্রস্তাবিত উচ্চ কক্ষ প্রতিটি রাজনৈতিক দলের প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে গঠিত হবে।
বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকের পর জাতির উদ্দেশে টেলিভিশন ভাষণে এসব সিদ্ধান্তের কথা জানান মুহাম্মদ ইউনূস। এই সিদ্ধান্ত বেশ বাস্তবসম্মত, কিছুটা কৌশলগতও।
এরই মধ্যে কিছু রাজনৈতিক দল এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে, কেউ কেউ প্রত্যাখ্যানও করেছে। অবশ্য ভাষণে সরকারের সিদ্ধান্ত সরাসরি প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ খুব কমই রেখেছেন প্রধান উপদেষ্টা।
চলমান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মূল দুই পক্ষ বিএনপি কিংবা জামায়াতে ইসলামী কেউই এই সিদ্ধান্ত সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেনি। বিএনপি প্রধান উপদেষ্টার বিরুদ্ধে সই হওয়া সনদের মূল চেতনা থেকে বিচ্যুত হওয়ার অভিযোগ তুলেছে। অন্যদিকে জামায়াত সতর্ক করে বলেছে যে, এই পদক্ষেপ রাজনৈতিক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
তবুও উভয় দলের বক্তব্যে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকে অনিচ্ছাকৃতভাবে মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত মেলে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব সিদ্ধান্তকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার প্রচেষ্টার একটি নতুন মোড় হিসেবে দেখছেন। কারণ এই ঘোষণা সংস্কার প্রক্রিয়া ঘিরে থাকা অনিশ্চয়তা কমাতে পারে। যদিও এটি পিআর পদ্ধতির ক্ষেত্রে নতুন উত্তেজনাও সৃষ্টি করেছে।
জামায়াত ও তার মিত্রদের জন্য, পিআর পদ্ধতি একটি বড় অর্জন। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে সামান্য সমর্থন থাকলেও উচ্চ কক্ষে আসন পাওয়া যেতে পারে। তবে বিএনপির জন্য এটি মেনে নেওয়া কঠিন। বর্তমান বাংলাদেশের অন্যতম এই রাজনৈতিক দলটি এখন এই ব্যবস্থার সরাসরি বিরোধিতা করবে, নাকি রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার স্বার্থে এটিকে মেনে নেবে, তা নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিতর্কের মুখে পড়েছে।
দলের অবস্থান চূড়ান্ত করতে মঙ্গলবার রাতে বিএনপির স্থায়ী কমিটি বৈঠক করেছে। সেখানে একই দিন গণভোট ও সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়ায় প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানায় বিএনপি।
তবে জুলাই সনদ এর সুপারিশে ‘নোট অব ডিসেন্ট ‘ না রেখেই সনদ গেজেট আকারে প্রকাশ করায় সরকারের কঠোর সমালোচনাও করা হয়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করে বলছেন, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের সূত্রের বিরুদ্ধে বিএনপির কঠোর প্রতিক্রিয়া জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন রাজনৈতিক সমস্যার সূত্রপাত করতে পারে। আবার এটি মেনে নিলে তা হলে রাজনৈতিকভাবে জুয়া খেলার মতোই।
গত ১৭ অক্টোবর সই হওয়া জুলাই সনদে ব্যাপক রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের কাঠামো রয়েছে। এটিতে সই করার মাধ্যমে, বিএনপি ও জামায়াতসহ ২৪টি রাজনৈতিক দল একটি দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদ, ক্ষমতার আরও সুষম বন্টন এবং বেশ কিছু সংস্কার পদক্ষেপ বাস্তবায়নে অঙ্গীকারে সম্মত হয়েছে।
গত ২৮ অক্টোবর জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন দুটি বিকল্প বাস্তবায়ন পরিকল্পনা জমা দিয়েছিল। অবশ্য সেটি প্রধান দলগুলোর অবস্থানের মধ্যেকার ব্যবধান কমাতে পারেনি। তাই ইউনূসের এই ঘোষণাকে অন্তর্বর্তী সরকারের নিষ্পত্তির চেষ্টা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
গণভোটকে সাধারণ নির্বাচনের সঙ্গে সমন্বয় করে ইউনূস উভয় ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত খরচ এবং দীর্ঘায়িত রাজনৈতিক বিতর্কের সম্ভাবনা কমিয়ে দিয়েছেন।
ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘যথাযথ বিবেচনার পর, আমরা পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটি কোনোভাবেই সংস্কারের লক্ষ্যকে বাধা দেবে না। বরং এটি নির্বাচনকে আরও উৎসবমুখর ও সাশ্রয়ী করবে। গণভোটের জন্য প্রয়োজনীয় আইন উপযুক্ত সময়ে প্রণয়ন করা হবে।’
তিনি জানান, উপদেষ্টা পরিষদ জুলাই জাতীয় সনদ (সাংবিধানিক সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুমোদন করেছে। পরে এ বিষয়ে একটি গেজেট জারি করা হয়।
মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে জনগণ জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী চূড়ান্ত করা চারটি বিষয়ে ভোট দিতে পারবে।
তিনি বলেন, প্রশ্নটি হবে: আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?
ক) নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।
খ) আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।
গ) সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।
ঘ) জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
গণভোটের দিন এই চারটি বিষয়ের ওপর একটিমাত্র প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে মতামত জানাতে হবে বলে জানান প্রধান উপদেষ্টা।
যদি সংখ্যাগরিষ্ঠরা ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়, তবে পরবর্তী সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে একটি সাংবিধানিক সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে।
এই পরিষদ তার প্রথম অধিবেশন থেকে সাংবিধানিক সংশোধনী চূড়ান্ত করার জন্য ১৮০ কার্যদিবস সময় পাবে। সংস্কার কাজ শেষ হওয়ার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে আনুপাতিকভাবে উচ্চ কক্ষ গঠিত হবে এবং নিম্ন কক্ষের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এটি বহাল থাকবে।
ইউনূস আরও বলেন, ‘পূর্বে অনুমোদিত নির্বাহী আদেশে যেমনটি বলা হয়েছে, জুলাই সনদকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
গণঅভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর কী কী কাজ করেছেন তা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘অর্থনীতিকে “গভীর অতল গহ্বর” থেকে উদ্ধার করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। গত ১৫ মাসে আমরা সেই চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছি। রপ্তানি, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং রিজার্ভসহ সকল প্রধান অর্থনৈতিক সূচক ইতিবাচক ধারায় ফিরে এসেছে। লুট হওয়া ব্যাংকিং খাত পুনরুদ্ধার হয়েছে এবং জনগণের আস্থা ফিরে এসেছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ প্রক্রিয়াধীন।’
তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ কমে যাওয়া সত্ত্বেও, অভ্যুত্থানের পরের প্রথম বছরে বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ ১৯ দশমিক ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বৈশ্বিক প্রবণতার বিপরীতে একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন।


