পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে যখন একের পর এক প্রাণিকুল হারিয়ে যাচ্ছে, তখন এক চমকপ্রদ খবর নিয়ে এসেছে অ্যান্টার্কটিকা অঞ্চলের রাজা পেঙ্গুইন বা কিং পেঙ্গুইনরা। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবর্তিত আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে এই পেঙ্গুইনরা তাদের প্রজনন সময় এগিয়ে এনেছে।
সাব-অ্যান্টার্কটিক দ্বীপপুঞ্জের প্রায় ১৯ হাজার পেঙ্গুইনের ওপর চালানো এই গবেষণায় দেখা যায়, ২০০০ সালের তুলনায় তারা এখন প্রায় ১৯ দিন আগেই বংশবিস্তার শুরু করছে। এই পরিবর্তনের ফলে তাদের প্রজনন সফলতার হার শতকরা ৪০ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিজ্ঞানীদের বেশ অবাক করেছে।
সাধারণত প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম বা ঋতুচক্রের বদল প্রাণিজগতের জন্য বিপদ ডেকে আনে। অনেক ক্ষেত্রে শিকারি প্রাণীর সঙ্গে তার শিকারের অমিল ঘটে কিংবা ফুল ফোটার সময়ের সঙ্গে মৌমাছিদের পরাগায়নের সময় মেলে না। কিন্তু কিং পেঙ্গুইনরা এই প্রতিকূলতাকেই নিজেদের অনুকূলে নিয়ে এসেছে। অন্যান্য প্রজাতির পেঙ্গুইন যখন নির্দিষ্ট সময়ে প্রজনন করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, তখন কিং পেঙ্গুইনরা অক্টোবর থেকে মার্চ মাসের দীর্ঘ সময়ের যেকোনো পর্যায়ে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাখছে। তাপমাত্রা বাড়ার কারণে তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি নমনীয় হয়ে উঠেছে।
কিং পেঙ্গুইনদের এই সাফল্যের আরেকটি বড় কারণ হলো তাদের খাদ্যাভ্যাস ও বিচরণের বৈচিত্র্য। সাগরের তাপমাত্রা বাড়ার ফলে খাবারের উৎস বদলে গেলেও তারা নির্দিষ্ট কোনো এক জায়গায় আটকে থাকছে না। কেউ খাবারের সন্ধানে দক্ষিণে মেরু অঞ্চলের দিকে যাচ্ছে, কেউ উত্তরে যাচ্ছে, আবার কেউ নিজেদের কলোনির আশেপাশেই রয়ে যাচ্ছে। তাদের প্রধান খাবার ল্যান্টার্নফিশ হলেও প্রয়োজনের তাগিদে তারা অন্যান্য খাবার গ্রহণেও অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। খাবারের এই বৈচিত্র্যই তাদের প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।
তবে এই খুশির খবর কি দীর্ঘস্থায়ী হবে? বিশেষজ্ঞরা এখনই পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না। ক্যানটারবেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী মিশেল লারু এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইগনাসিও জুয়ারেজ মার্টিনেজের মতো গবেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এই উন্নতি হয়তো সাময়িক। জলবায়ু পরিবর্তনের গতি যেভাবে বাড়ছে, তাতে ভবিষ্যতে এই পেঙ্গুইনরা আর কতদিন নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবে তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। এখন পর্যন্ত তারা বিপদমুক্ত তালিকায় থাকলেও সামনের দিনগুলোতে বৈশ্বিক উষ্ণতা তাদের এই অর্জনকে ম্লান করে দিতে পারে। তাই আজ রাজা পেঙ্গুইনদের জন্য সুদিন মনে হলেও প্রকৃতির এই অনিশ্চিত পরিবর্তনের দিকে বিজ্ঞানীদের কড়া নজর রাখতে হচ্ছে।


