জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বছরে বাংলাদেশের যে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয় তা মোকাবিলায় নতুন কৌশল নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে মঙ্গলবার সকালে ‘ইনক্লুসিভ বাজেটিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিং ফর ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স (আইবিএফসিআর) ফেজ-টু’ কর্মসূচির উদ্বোধন করে অর্থ বিভাগ।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন শিল্প বিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় রেকর্ড এক দশমিক ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, যার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশে। অথচ বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে বাংলাদেশের অবদান মাত্র দশমিক ৫৬ শতাংশ। প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়ে দেশের জিডিপির দশমিক সাত শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে। আবার ২০৪০ সালের মধ্যে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে কৃষি উৎপাদন ১৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিবাসনের কারণে বাস্তুচ্যুত হতে পারে এক কোটি ৩৩ লাখ বাংলাদেশি।
প্রতি বছর জিডিপির প্রায় তিন শতাংশ অর্থাৎ ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি পূরণে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ফাইন্যান্স ডিভিশন, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ও ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা এএফডির সহায়তায় কর্মসূচির দ্বিতীয় ধাপের উদ্বোধন করা হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি অর্থ বিভাগের সচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ‘বৈশ্বিক উষ্ণায়নে বাংলাদেশের ভূমিকা অতি সামান্য হলেও এর প্রভাব আমাদেরই সবচেয়ে বেশি ভোগ করতে হচ্ছে। আমরা অভিযোজনমূলক কর্মসূচি ও প্রতিকারমূলক পদক্ষেপে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমার বিশ্বাস, আইবিএফসিআরের দ্বিতীয় ধাপ জনগণ ও অর্থনীতির জন্য আরও শক্তিশালী স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।’
গত বছর প্রণীত ও সংশোধিত জলবায়ু পরিবর্তন কর্মপরিকল্পনা এই কার্যক্রম পরিচালনায় রোডম্যাপ হিসাবে কাজ করছে এবং কার্যকর সম্পদ আহরণে সহায়তা দিচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব বিলকিস জাহান রিমি বলেন, ‘কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রণালয় ও অংশীজনদের মধ্যে সমন্বয়ের শক্তিশালী কাঠামো প্রয়োজন। সহযোগিতা বাড়ানো ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার করা গেলে জলবায়ু অগ্রাধিকারগুলো সরকারি আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে পূর্ণাঙ্গভাবে যুক্ত করা সম্ভব হবে।’
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) রেসিডেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ স্টেফান লিলার বলেন, ‘আইবিএফসিআর মূলত জলবায়ু অগ্রাধিকারকে সরকারি অর্থ ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসবে। যেন ব্যয় করা প্রতিটি টাকা মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারে।’
আইবিএফসিআর ফেজ-টু একটি কারিগরি সহায়তা কর্মসূচি জানিয়ে ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা এএফডির ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর সিসিলিয়া কর্টেসে বলেন, ‘এই কর্মসূচি ৩০০ মিলিয়ন ইউরোর নীতিনির্ভর ঋণ কর্মসূচির পরিপূরক। এই ঋণ বাংলাদেশ সরকারের জলবায়ু কৌশল ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তা করবে।’
আইবিএফসিআর ফেজ-টু প্রথম ধাপের অভিজ্ঞতার আলোকে জলবায়ু অর্থায়নের কাঠামো হালনাগাদ, অর্থায়ন পর্যবেক্ষণ জোরদার এবং জাতীয় জলবায়ু অর্থায়ন কৌশল প্রণয়ন করবে। পাশাপাশি স্থানীয় অভিযোজন কর্মপরিকল্পনা (লাপা) ও জলবায়ু ঝুঁকি সূচক (সিভিআই) ব্যবহারকে উৎসাহিত করবে যেন অর্থ সহায়তা সরাসরি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাজেট প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সমন্বয় বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের বাজেট ব্যবস্থাকে প্যারিস চুক্তি, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি), জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ন্যাপ) এবং জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদানের (এনডিসি) সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হবে। সরকারি অর্থ ব্যবস্থার মূল কাঠামোয় জলবায়ু সহনশীলতা অন্তর্ভুক্ত করে দেশটি উন্নয়ন অর্জন সুরক্ষিত করবে এবং জনগণকে বাড়তি জলবায়ু ঝুঁকি থেকে রক্ষা করবে।


