চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসন নিয়ে অস্থিরতার মধ্যে এবার আসনটিতে উন্মুক্ত নির্বাচন চেয়েছেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া মো. ওমর বিন নুরুল আবছারের মা রুবি আক্তার। তিনি বলেছেন, এই আসনটি ওপেন রাখা হোক। এখানে এনসিপিও নির্বাচন করবে, জামায়াতের আবু নাছের ভাইও করবে।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ১০ দিনব্যাপী নির্বাচন ক্যাম্পেইন শুরুর প্রথম দিনে দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার কাছে তিনি এই দাবি জানান।
গত ২০ জানুয়ারি ১০ দলীয় জোটের আসন ঘোষণা করেন জামায়াতের নায়েবে আমির আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। ওই দিন চট্টগ্রাম-৮ আসনে জোটের প্রার্থী হিসেবে এনসিপির প্রার্থী জুবাইরুল হাসান আরিফকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এরপর থেকে আসনটি নিয়ে শুরু হয় নাটকীয়তা।
নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিল ২০ জানুয়ারি। সেদিন জোট সমর্থিত প্রার্থী ছাড়া জোটভুক্ত অন্যান্য দলের প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করার কথা ছিল।
আসনটির মনোনয়ন বাছাইয়ের দিনে ১০ দলীয় জোটের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আবু নাছের, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোহাম্মদ এনায়েত উল্লাহ এবং এনসিপির প্রার্থী জুবাইরুল হাসান আরিফ এই তিনজনের মনোনয়ন বৈধতা পায়।
জোট থেকে এনসিপির প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার পর খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন। তবে, ওই দিন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার না করায় রাতে নগরের একটি হোটেলে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ এনে সংবাদ সম্মেলন করেন এনসিপির প্রার্থী জুবাইরুল হাসান আরিফ।
ব্যানারের ওপর লেখা ছিল–‘১০ দলীয় জোটের সিদ্ধান্ত অমান্য করে চট্টগ্রামে এনসিপির একমাত্র আসন চট্টগ্রাম-৮-এ জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীর স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন।’
সংবাদ সম্মেলনে আরিফ বলেন, ‘ঐক্যবদ্ধ না হলে জুলাইয়ের লক্ষ্য পূরণ হবে না। তাই আমরা ১০ দলীয় ঐক্য করেছি। জোটের সিদ্ধান্ত হলো সব দলই প্রার্থী দেবে, তবে জোট যাকে চূড়ান্ত করবে, তিনি ছাড়া বাকিরা মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেবেন। কিন্তু এ আসনে একটি অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটেছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে মো. জুবাইরুল হাসান আরিফ বলেন, ‘স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়টি আসলে ভুল বোঝাবুঝি। আমি জামায়াতের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা জানিয়েছেন, দলের প্রার্থী আবু নাছের চট্টগ্রামে না থাকায় সময়মতো মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে পারেননি।’
ওই সংবাদ সম্মেলনে খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম-৮ আসনে মো. জুবাইরুল হাসান আরিফকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তিনিই চূড়ান্ত প্রার্থী। আমি তাকে সমর্থন জানিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছি। আমরা জামায়াতের প্রার্থীকে অনুরোধ করব, ১০ দলের ঐক্যকে সমর্থন জানাতে।’
এনসিপির প্রার্থীর সংবাদ সম্মেলনের পরদিন ২১ জানুয়ারি ছিল প্রতীক বরাদ্দের দিন। মনোনয়ন প্রত্যাহার না করায় নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী জামায়াতের প্রার্থী আবু নাছের দাঁড়িপাল্লা প্রতীক বরাদ্দ পান।
ওই দিন বিকালে সংবাদ সম্মেলন ডেকে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা জানান চট্টগ্রাম-৮ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আবু নাছের। সংবাদ সম্মেলনে তিনি উপস্থিত ছিলেন না।
তার সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা গণমাধ্যমকে জানান জামায়াতের পক্ষ থেকে ওই আসনের পরিচালক ও নগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মোরশেদুল ইসলাম চৌধুরী।
তিনি বলেন, দলীয় সিদ্ধান্তে জোটের ঐক্যের স্বার্থে এনসিপি প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়ে আবু নাছের আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
পরদিন থেকে বিষয়টি আরও নাটকীয় রূপ নেয়। আসনটিতে আবু নাছেরের সমর্থকরা এনসিপির প্রার্থী জুবাইরুল হাসান আরিফকে বয়কট করে প্রচারণায় মাঠে নামেন। প্রতিদিন জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে মিছিল করছেন আবু নাছেরের সমর্থকেরা।
স্থানীয়দের মতে, তফসিল ঘোষণার আগে চট্টগ্রাম-৮ আসনে এনসিপির প্রার্থীর তেমন তৎপরতা দেখা না গেলেও জোটের অন্য প্রার্থীরা মাঠ চষে বেড়াচ্ছিলেন এবং ভালো অবস্থানে ছিলেন আবু নাছের।
বিষয়টি নিয়ে আবু নাছেরের একাধিক সমর্থক বলেন, ‘তিনি দীর্ঘদিন ধরে বোয়ালখালী-চান্দগাঁও আসনে কাজ করে আসছেন। তার বাড়িও বোয়ালখালীতে। এ ছাড়া, একজন মানবিক চিকিৎসক হিসেবে নাছের অত্যধিক পরিচিত। সেখানে নতুন একজনকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ায় কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর জন্য আসনটি ফাঁকা হয়ে যায়।’
ফলশ্রুতিতে, ২৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম-৮ আসনে জামায়াতের বিরুদ্ধে জোটের সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন ও শরিক দলের সঙ্গে ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ অভিযোগ তোলে এনসিপি। দলটির দাবি, ১১ দলীয় ‘ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ’ জোটের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে জামায়াত প্রার্থী মাঠে অনড় থাকা এবং এনসিপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে সরাসরি ‘বয়কট’ স্লোগান দেওয়া রাজনৈতিক শিষ্টাচারের চরম লঙ্ঘন। তারা জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করে।
এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এনসিপির বোয়ালখালী উপজেলার প্রধান সমন্বয়কারী কাজী ইয়াছিন বলেন, ‘জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চট্টগ্রাম-৮ আসনে এনসিপির প্রার্থী জুবাইরুল আরিফকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জামায়াতের প্রার্থী আবু নাছের মনোনয়ন প্রত্যাহার না করায় এলাকায় রাজনৈতিক ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।’
যদিও বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন কথা বলেন জামায়াতের নগর সহকারী সেক্রেটারি মোরশেদুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছি। আবু নাছের পরিচিত মুখ হওয়ায় এবং দীর্ঘদিন ধরে আসনটিতে কাজ করায় বোয়ালখালী-চান্দগাঁও আসনের সাধারণ জনগণ বিষয়টি মানতে পারছেন না। আমাদের কোনো নেতাকর্মী দাঁড়িপাল্লার সমর্থনে মিছিল বা প্রচারণা চালাচ্ছে না। আমরা সবসময় কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তকে মানতে বাধ্য। আমাদের চেইন অব কমান্ড এক।’
তিনি বলেন, ‘জোট যাকে প্রার্থী দিয়েছে আমরা তার পক্ষে মাঠে রয়েছি। আমাদের নেতাকর্মীও জোটের প্রার্থীর সাথে প্রচারণা চালাচ্ছে।’
সোমবার নির্বাচনী সফরে চট্টগ্রামে আসেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। সকালে তিনি চট্টগ্রামের লোহাগাড়া এলাকায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ইশমামের কবর জিয়ারত করেন। দুপুরে নগরের বহদ্দারহাট এলাকায় জনসভা করার কথা থাকলেও সেখানে গিয়ে দেখা যায়, এনসিপির কোনো কর্মী-সমর্থক উপস্থিত নেই। পরে সেখানে অবস্থান না করেই তারা বোয়ালখালী ফিরে যান।
পরে ফুলতলায় জনসভায় যান এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। পোস্টার, মাইক ও কয়েক ডজন কর্মী সব মিলিয়ে ছিল প্রচারণার সাধারণ চিত্র। কিন্তু উপস্থিত জনতার দৃষ্টি তখন অন্যদিকে। শহীদ ওমরের মা রুবি আক্তার সেখানে পৌঁছালে মানুষের ভিড় জমে যায়। অল্প কথায়, শান্ত গলায়, কিন্তু ক্ষতবিক্ষত অভিজ্ঞতা আর গভীর আক্ষেপ মিশিয়ে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম-৮ আসনে স্থানীয় মানুষের ভোটই বেশি। স্থানীয় মানুষ চাইবে স্থানীয় মানুষকেই ভোট দিতে।
তিনি বলেন, ‘আবু নাছের কখনো জুলাইকে বিক্রি করেননি, কোনো সুবিধাও নেননি। তার পরিবার সবসময় এলাকার মানুষের পাশে ছিল। এই আসন যদি কোনো কারণে খালি হয়ে যায়, তাহলে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।’
রুবি আক্তারের কথা থামিয়ে এনসিপির প্রার্থী জুবাইরুল হাসান আরিফ বলেন, ‘আন্টি, আমরা ১০ দলীয় জোট। সবাই সহযোগিতা করলে এই সিট কখনো হাতছাড়া হবে না।’
এর উত্তরে রুবি আক্তার বলেন, ‘জোট ঠিক আছে, কিন্তু এখানে স্থানীয় মানুষ অনেক বেশি। জোটের ভোট ২০ শতাংশ, স্থানীয় ভোট ৮০ শতাংশ। যাকে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে, তাকে তো কেউ চেনে না।’
রুবি আক্তারের এই কথায় যেন ব্যক্তিগত ক্ষোভের পাশাপাশি এলাকার নির্বাচনী অঙ্কও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ সময় আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আমরা তো এখন মাঠে নেমে গেছি।’
এর জবাবে রুবি আক্তার স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘তাহলে আমি বলি, এই আসনটি ওপেন রাখা হোক। এনসিপিও করবে, জামায়াতের আবু নাছের ভাইও করবে।’


