পাহাড় এবং ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্তবেষ্টিত বন্দর নগরী চট্টগ্রামে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে অস্ত্র পাচার। গত কয়েকমাস ধরেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো অস্ত্র উদ্ধারের বেশ উদ্বেগজনক ধারা উন্মোচন করতে শুরু করেছে। আগ্নেয়াস্ত্র পাচারের সঙ্গে জড়িত চক্রগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে বলে মনে করা হলেও, দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর হাত ধরে সেগুলো নতুন করে আবির্ভূত হচ্ছে।
অবৈধ অস্ত্রের এই পুনঃউত্থান এমন সময়ে হচ্ছে যখন দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংস অপরাধের ঘটনা বাড়ছে। নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বলছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অরক্ষিত সীমান্ত পথগুলোর সম্মিলিত প্রভাবেই অস্ত্র নেটওয়ার্কগুলো ফের সক্রিয় হয়ে উঠছে। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকের এই নেটওয়ার্কগুলো দীর্ঘসময় সুপ্ত অবস্থায় ছিল বলেই এখন মনে হচ্ছে। সেই সময় এই বন্দর নগরীতেই অস্ত্রের বিরাট চালান আটক হয়েছিল, যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতেও হয়েছিল শিরোনাম।
তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, জব্দ করা অনেক অস্ত্রের সিরিয়াল নম্বর ২০২৪ সালের জুলাই মাসের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের সিরিয়াল নম্বরের সাথে মিলে যাচ্ছে। যার মধ্যে কিছু অস্ত্র একসময় আওয়ামী লীগ নেতাদের নামে ছিল।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা যে অস্ত্রগুলো উদ্ধার করেছি সেগুলো নতুন পাচার হওয়া নয়। এগুলো পুরোনো আগ্নেয়াস্ত্র। কিছু কিছু এক দশকেরও বেশি পুরোনো। এর অর্থ হলো, অনেক অবৈধ অস্ত্র বছরের পর বছর ধরে অপরাধীদের মধ্যে হাতবদল হচ্ছে। যেগুলো এতদিন শনাক্ত বা উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়েছে প্রশাসন।’
পুরোনো কিন্তু মারাত্মক
র্যাবের একটি সূত্র জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মধ্যে আমেরিকান, ভারতীয়, চীনা, তুর্কি এবং স্থানীয়ভাবে রূপান্তরিত মডেল রয়েছে। কর্মকর্তারা মনে করেন, এগুলোর মধ্যে অনেক অস্ত্র একসময় রাজনৈতিক মজুদের অংশ ছিল। অথবা এমনও হতে পারে যে পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং ভারত ও মিয়ানমারের নিকটবর্তী সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলো থেকে সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করেছে।
গত দুই দিনে বেশ বড় অভিযানে রাউজান থেকে নয়টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ। যা সাম্প্রতিক মাসগুলোয় এককভাবে সবচেয়ে বড় জব্দের ঘটনা। এই চালানের মধ্যে চারটি পিস্তল, একটি রাইফেল, একটি শটগান, দুটি দেশীয় তৈরি বন্দুক এবং শত শত রাউন্ড গুলি রয়েছে।
এর মধ্যে চারটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পিস্তল, যার মধ্যে দুটিকে পুলিশের ইস্যু করা অস্ত্র হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। যেগুলো চুরি হয়ে গেছে বলে জানানো হয়েছিল।
তদন্ত কর্মকর্তাদের সন্দেহ, এসব অস্ত্রগুলো গত সপ্তাহে বিএনপি নেতা আব্দুল হাকিম হত্যাকাণ্ডসহ সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি অপরাধে ব্যবহৃত হয়েছে।
শুধুমাত্র গত এক বছরেই, নিরাপত্তা বাহিনী চট্টগ্রামজুড়ে ৪৪৪টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে এবং সীতাকুণ্ড ও আনোয়ারায় দুটি অস্থায়ী অস্ত্র কারখানা ধ্বংস করেছে।
পুলিশের ডিআইজি (চট্টগ্রাম রেঞ্জ) আহসান হাবিব পলাশ বলেন, ‘সাধারণ ধারণা হলো এই অস্ত্রগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে আসে। স্থানীয় অপরাধীরা প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলো কিনে নেয় এবং পরে পাহাড়ের গভীরে লুকিয়ে রাখে।’
যে অস্ত্রের রয়েছে ঘটনাবহুল অতীত
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, চট্টগ্রামে জব্দ হওয়া এসব আগ্নেয়াস্ত্রের উৎস দ্বৈত। কিছু ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত পেরিয়ে পাচার হয়ে এসেছে, অন্যগুলো পূর্ববর্তী রাজনৈতিক শাসনামলে গড়ে ওঠা দেশীয় ভাণ্ডার থেকে এসেছে।
গোয়েন্দা সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, জব্দ করা বেশ কয়েকটি অস্ত্রের সঙ্গে পুরোনো অপরাধমূলক মামলার যোগসূত্র পাওয়া গেছে ব্যালিস্টিক পরীক্ষায়, যা অপরাধ জগতের মধ্যে অস্ত্র পুনর্ব্যবহারের একটি ধারা প্রকাশ করছে।
মূলত নতুন সরবরাহ কমে গেলে, পুরোনো অস্ত্রগুলো মেরামত করে কালোবাজারে ছাড়া হয়। যার মাধ্যমে টিকে থাকে সহিংসতার এক দীর্ঘস্থায়ী ইকোসিস্টেম।
ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, সচল নেটওয়ার্ক
সীমান্তবর্তী জেলা অর্থাৎ রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান এবং কক্সবাজার; বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ রয়ে গেছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগীরা মাদক বা নগদ অর্থের বিনিময়ে ছোট অস্ত্রের চালান অব্যাহত রেখেছে, যা একটি আন্তঃসীমান্ত ছায়া অর্থনীতিকে ইন্ধন জোগাচ্ছে। আর এই চক্র ভাঙতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনী।
পাহাড়ের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দমনে কাজ করে এমন একটি সরকারি সংস্থার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ভারত থেকে নতুন অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা করেছে। সম্প্রতি জব্দ করা কিছু অস্ত্র ইউপিডিএফ-এর ঘাঁটিতে পৌঁছানোর আগেই আটক করা হয়েছে।’
পরিস্থিতির গুরুত্ব স্বীকার করে লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, ‘চট্টগ্রামের পরিস্থিতি গুরুতর। আমরা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের জন্য বিশেষ অভিযানের সুপারিশ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। সমস্যাটি যতটা মনে করা হচ্ছে তার চেয়েও গভীর এবং পুরোনো।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অস্ত্রের এই নতুন প্রবাহ কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিষয় নয়, বরং এটি গভীর রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক নানা অসঙ্গতিরও প্রমাণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যায়ন বিভাগের প্রধান ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী টাইমসকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের একটি উপজাত। বেকারত্ব ও বৈষম্য অনেককে অস্ত্র অর্থনীতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের এই নেটওয়ার্কগুলো পরস্পর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। যা সমস্যাটিকে যতটা নিরাপত্তা-সম্পর্কিত, ততটাই সামাজিক করে তুলেছে।’
রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতিটি পরিবর্তন কেবল অস্ত্রগুলোকে অপসারণ না করে বরং সেগুলোর পুনর্বণ্টন করে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
‘পাহাড়, সীমান্ত এবং বন্দর; সবকিছু মিলে গোপন বাণিজ্যের জন্য একটি নিখুঁত ত্রিভুজ তৈরি করেছে। যা সরকার, মতাদর্শ এবং দমন-পীড়নকে অতিক্রম করে গেছে,’-যোগ করেন তিনি।


