বিএনপি সরকারের গঠিত সংবিধান সংশোধন কমিটিকে ‘একদলীয়’ আখ্যা দিয়ে তা বিলুপ্ত করার দাবি জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
দলটির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেছেন, গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে।
শনিবার জুলাই জাতীয় সনদে সইয়ের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে রাজধানীর বাংলামোটরে দলের অস্থায়ী কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান আখতার হোসেন।
তিনি অভিযোগ করেন, সংস্কার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও বিএনপি সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে।
আখতার বলেন, ‘অক্ষরে অক্ষরে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বলে তারা অক্ষরে অক্ষরে জাতির সঙ্গে ধোঁকাবাজি করছে।’
সনদের বিভিন্ন প্রস্তাবের শেষে যুক্ত করা একটি নোটের সমালোচনা করে আখতার বলেন, ‘ওই নোটে বলা হয়েছে, কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট নির্বাচনী ইশতেহারে কোনো বিষয় উল্লেখ করে জনগণের ম্যান্ডেট পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে।’
তার দাবি, ঐকমত্য কমিশনের ১৭ তারিখে পাঠানো চূড়ান্ত খসড়ায় নোটটি ছিল না। সনদে সইয়ের দিন সরকারপক্ষের একজন ব্যক্তি আলোচনা ছাড়াই এটি যুক্ত করেন। ভবিষ্যতে সনদ বাস্তবায়ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতেই নোটটি যুক্ত করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
গণভোটের রায় প্রসঙ্গে এনসিপির সদস্যসচিব বলেন, জনগণ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ায় নির্বাচিত সংসদের প্রত্যেক সদস্যকে সেই রায় মানতে হবে। অথচ এখন গণভোটের রায় অস্বীকার করে একে অসাংবিধানিক হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন আখতার।
তার অভিযোগ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সচিবালয়টি প্রতিষ্ঠা করলেও বিএনপি ক্ষমতায় এসে তা বাতিল করেছে। এ বিষয়ে বিএনপির কোনো ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আখতার। কয়েকটি কমিটির সভাপতির দায়িত্ব বিরোধী দলকে দেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য থাকলেও সরকার তা বাস্তবায়ন করেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি। সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দল অংশ না নেওয়ায় তাদের স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ দেওয়া হবে না, এমন যুক্তিও গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিএনপির গঠিত সংবিধান সংশোধন কমিটি সম্পর্কে আখতার বলেন, ‘এই একদলীয় সংবিধান সংশোধন কমিটি গণভোটের সঙ্গে প্রতারণা। এই একদলীয় সংবিধান সংশোধন কমিটি কোনোভাবেই সাংবিধানিক সংকটের সুরাহা করতে পারবে না।’
এনসিপি ওই কমিটিতে অংশ নেবে না জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারকে কমিটি বিলুপ্ত করে গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে।
১৯৯০ সালের তিন জোটের রূপরেখা বাস্তবায়ন না হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে আখতার আশঙ্কা প্রকাশ করেন, বিএনপি এবারও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে খুব বেশিদিন আপনাদের কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে পারবেন না। হয়ত টু-থার্ড মেজরিটি আপনাদের আছে। কিন্তু জনগণের রায় যেখানে থাকে না, সেখানে টু-থার্ড মেজরিটি কোনোভাবেই অগ্রসর হতে পারে না।’
উন্নয়ন বরাদ্দেও বিরোধী দলের আসনগুলো বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন এনসিপির এই নেতা। তার দাবি, সরকারি দলের ২০৩টি আসনে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হলেও বাকি ৯৭টি আসনে তা দেওয়া হয়নি।
সেতু ও কালভার্ট নির্মাণে প্রায় আট হাজার কোটি টাকার প্রকল্পেও বিরোধী দলের আসনগুলো উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সার ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে আত্মীয়তার কারণে কেউ কেউ লাইসেন্স পেয়েছেন। এতে সারসংকট আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে দলীয়করণ ও জনস্বার্থ উপেক্ষার অভিযোগ করে আখতার বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসের মধ্যেই সরকারের প্রতি মানুষের অসন্তোষ বাড়ছে।
সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার অভিযোগ করেন, বিএনপি গণভোটের বিষয়টি উপেক্ষা করে ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করতে চায়। জনচাপের মুখে সরকার সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিলেও প্রক্রিয়াটি একতরফা ও বেআইনিভাবে পরিচালনা করছে বলে দাবি করেন তিনি।
এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব সালেহ উদ্দিন সিফাত বলেন, ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি এমন অনেক সংস্কার থেকেও সরে এসেছে, যেগুলোর বিষয়ে দলটির কোনো ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছিল না। সংস্কারকে এনসিপির প্রধান রাজনৈতিক এজেন্ডা বলেও উল্লেখ করেন তিনি।


