ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন বাসে ওঠা নারীদের জন্য যুদ্ধের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। যাত্রীতে পরিপূর্ণ গণপরিবহন, ভিড়ের সুযোগে অযাচিত স্পর্শ এবং নানা ধরনের অসম্মানজনক কথাবার্তা নারীর যাতায়াতকে পরিণত করে নিরন্তন সংগ্রামে। যেখানে প্রতিনিয়ত নিজের নিরাপত্তা আর মর্যাদার সঙ্গে তাকে আপোষ করতে হয়।
প্রতিদিনের পথের এই দুর্ভোগকে মৌলিক মর্যাদার জন্য লড়াই হিসেবে উল্লেখ করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাইজা ফাইরুজ। তিনি বলেন, ‘আমি ১২ বা ১৩ বছর বয়স থেকে লোকাল বাসে যাতায়াত করছি এবং পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপই হচ্ছে।’
বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারীর পর থেকে হয়রানির পরিমাণ বেড়েছে এবং আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে বলে নিজেরে অনুভবের কথা জানালেন ফাইজা। এখন বাসে উঠলে আগের চেয়েও বেশি সতর্ক থাকেন ফাইজা, দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে রেখে নিজেকে রক্ষার প্রাথমিক চেষ্টা করেন তিনি।
ক্লান্ত কণ্ঠে ফাইজা বলেন, ‘আমি এতবার আমার গায়ে হাত দেওয়ার সময় পুরুষদের হাত ধরে ফেলেছি যে তার কোনো হিসাব নেই।’
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। যেখানে দেখা গেছে চলন্ত বাসে এক নারীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করছেন এক ব্যক্তি। যার কারণ হিসেবে জানা যাচ্ছে, ওই নারী ওড়না বা স্কার্ফ পরেননি। আর এ বিষয়টি নিয়েই তার সঙ্গে ওই পুরুষের দ্বন্দ্বের শুরু।
ভুক্তভোগীর বন্ধু নাজিয়া হাসিন রাশা টাইমসকে জানান, ওই ব্যক্তি প্রথমে নারীটির পোশাক নিয়ে তাকে মৌখিকভাবে হয়রানি করে। যখন তিনি প্রতিবাদ করেন, তখন তাকে আক্রমণ করে। যদিও ভুক্তভোগী নারী ওই ব্যক্তিকে জুতা দিয়ে আঘাত করে প্রতিরোধ করেছিলেন, তারপরও এ ঘটনায় তিনি মানসিকভাবে ভীষণ ভেঙে পড়েছেন।
সংকটের উদ্বেগজনক চিত্র
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের এক গবেষণায় এসব ঘটনার ব্যাপকতা ফুটে উঠেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে গণপরিবহন ব্যবহারকারী ৯৪ শতাংশ নারী মৌখিক, শারীরিক বা অন্যান্য ধরনের যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।
গবেষণায় ৪১ থেকে ৬০ বছর বয়সী পুরুষদের ৬৬ শতাংশ ঘটনার জন্য দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে উঠে এসেছে যে, গণপরিবহনের অতিরিক্ত ভিড় শারীরিক নির্যাতনকে সহজ করে তোলে।
বেশিরভাগ বা ৮১ শতাংশ নারী হয়রানির প্রতিক্রিয়ায় হয় চুপ থাকেন, যাদের মধ্যে ৭৯ শতাংশ কিছু না বলে সরে যান। এ থেকেই বোঝা যায়, কত কম সংখ্যক নারীর কাছ থেকে প্রতিবাদ আসে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক বলেন, কোনো ধরনের বিচার বা পরিণতির মুখে পড়তে হয় না বলে গণপরিবহণ বিশেষত বাস যৌন হয়রানিকারীদের জন্য একটি ‘বিশেষ স্থান’ হয়ে উঠেছে।
টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘হয়রানিকারীদের আইনের আওতায় আনা খুবই জরুরি। তা না হলে কোনো ধরনের জবাবদিহিতা ছাড়া তাদের এই আচরণ চলতেই থাকবে।’
গণপরিবহনে ‘ইভ টিজিং’ এর মতো বিভিন্ন আচরণ মোকাবিলার জন্য নির্দিষ্ট, সহজে প্রয়োগযোগ্য হয়রানি-বিরোধী আইনের অভাবের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা এবং শূন্য জবাবদিহিতা
নারী অধিকার কর্মীরা বলছেন, হয়রানি এতই বেড়েছে যে তা নারীদের চলাফেরার অধিকারকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে। এটি তাদের দৈনন্দিন জীবনের কাজ এবং শিক্ষায় প্রবেশগম্যতাকেও প্রভাবিত করছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, ‘নারীদের চলাফেরার অধিকার হুমকির মুখে। তারা কখনো হয়রানির পড়লে বা এটি নিয়ে প্রতিবাদ করলে উল্টো তাদেরই দায়ী করা হয়। যা তাদের স্বাধীনতাকে সীমিত করে এবং মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে।’
এসব অপরাধের বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
মালেকা বেগম বলেন, ‘যখন এই ধরনের ঘটনা ঘটে, তখন সরকার বা প্রশাসনিক দিক থেকে কোনো জোরালো প্রতিক্রিয়া বা স্পষ্ট বার্তা আসে না। এটি নারী অধিকার রক্ষায় এক ধরনের অবহেলারই বহিঃপ্রকাশ।’
পরিবহন সংকট এবং থমকে থাকা সমাধান
এই নিরাপত্তা সংকট ঢাকার গণপরিবহন সংকটের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য মতে, ঢাকায় ১১০টি রুটে প্রায় সাড়ে চার হাজার যানবাহন চলাচল করছে। জনসংখ্যার অনুপাতে এই শহরে আরও ৭ হাজার ৪৩টি যানবাহন প্রয়োজন। এই ঘাটতি বাসের অতিরিক্ত ভিড়কে আরও বাড়িয়ে তোলে। যার ফলে শারীরিক হয়রানির শঙ্কাও বাড়ায়।
নিরাপদ গণপরিবহনের লক্ষ্যে সরকারি উদ্যোগগুলোও টেকসই হয় না। বিআরটিসি কেবল নারীদের জন্য কিছু বাস চালায়, তাও পিক আওয়ারে এবং নির্দিষ্ট কিছু রুটে। যা শহরের বিপুল কর্মজীবী নারীর চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ।
নারীদের জন্য সুবিধাজনক বিকল্প হিসেবে চালু হওয়া ‘গোলাপি বাস’ সার্ভিসটিও সীমিত রুট, উচ্চ খরচ এবং অপারেটরদের প্রতিরোধের কারণে ধুঁকছে।
এছাড়া, ঢাকা নগর পরিবহনের অধীনে ‘বাস রুট র্যাশনালাইজেশন’ পরিকল্পনাও থমকে আছে। যা এই খাতকে সংগঠিত ও উন্নত করার প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করছে।
ডিটিসিএ’র নির্বাহী পরিচালক নীলিমা আক্তার বলেন, সরকার বাস রুট র্যাশনালাইজেশন এবং এই খাতের উন্নতির জন্য বাস মালিক সমিতির সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা করছে। বিআরটিসি বর্তমানে নারীদের জন্য সীমিত পরিসরে কিছু বাস সার্ভিস পরিচালনা করলেও সাধারণ বাসে নারী যাত্রীর নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
নারী অধিকার কর্মী এবং আন্দোলনকারীরা বলছেন, নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং তাদের চলাফেরার পূর্ণ অধিকার ফিরে পেতে প্রয়োজন বৃহত্তর জনসচেতনতা। পাশাপাশি যানবাহনে হটলাইন নম্বর স্পষ্টভাবে প্রদর্শন এবং যাত্রী ও পরিবহন চালক উভয়ের সক্রিয় হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তারা।


