ক্রসফায়ার ইস্যুতে আইজিপি বদলের আভাস, আলোচনায় যারা

ক্রসফায়ার ইস্যুতে আইজিপি বদলের আভাস, আলোচনায় যারা
এসআরবি মহাপরিচালক মো. আহসান হাবিব পলাশ, সিআইডি প্রধান মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন, এপিবিএন প্রধান হাসিব আজিজ ও রেলওয়ে পুলিশ প্রধান মো. জিল্লুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। একাধিক রাজনৈতিক দল, মানবাধিকারকর্মী ও সংগঠন এবং সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে তাকে অপসারণের দাবি উঠেছে।

তারপরই সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে পুলিশের এই সর্বোচ্চ পদে নতুন কাউকে নিয়োগের বিষয়ে। সেক্ষেত্রে আলোচনায় এসেছে বেশ কয়েকজনের নাম।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপান সফর শেষে বৃহস্পতিবার দেশে ফেরার পর এ ব্যাপার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

গত সোমবার পুরান ঢাকার চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংকের এক অনুষ্ঠানে আইজিপি আলী হোসেন ফকির বলেন, ‘সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে পুলিশ ক্রসফায়ারে যেতে দ্বিধাবোধ করবে না। একই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, পুলিশ বলপ্রয়োগ করলে তাদের “ফ্যাসিস্ট” আখ্যা দেওয়া হয়, আর নিষ্ক্রিয় থাকলে “দুর্বল” বলা হয়। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশকে দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ দেওয়ার ওপরও জোর দেন তিনি।’

তার ক্রসফায়ার সংক্রান্ত বক্তব্য রাজনৈতিক মহল, মানবাধিকার সংস্থা এবং বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। যদিও সেদিন রাতেই এক ব্যাখ্যায় পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, আইজিপি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা বিচারবহির্ভূত শাস্তি বোঝাতে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব্যবহার করেননি; বরং অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ বোঝাতে তিনি রূপক অর্থে শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন।

এমনকি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, আইজিপি অসাবধানতাবশত এমন মন্তব্য করেছেন। তারপরও গুঞ্জন উঠেছে আইজিপি পদে বদল আসতে বেশি দেরি নেই।

পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি ও ডিআইজি পদমর্যাদার তিনজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বুধবার সকালে টাইমসকে বলেন, পুলিশ প্রধান হিসেবে মূল্যায়নের আগে কর্মদক্ষতা, ব্যক্তিগত আচারণ, চারিত্রিক দিক এবং রাজনৈতিক মতাদর্শ বিবেচনা করা হয়। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হয়। এরপরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সূত্র আরো জানায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও) কয়েকজন পদস্থ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত তথ্য সংবলিত নথি (ফাইল) নিয়ে কাজ করছে।

এই কর্মকর্তারা হলেন, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) মহাপরিচালক (ডিজি) অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবিব পলাশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজ, অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ও রেলওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি (চলতি দায়িত্ব) ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এই চারজন পদোন্নতি এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন।

অপর একটি সূত্র বলছে, পুলিশ প্রধান হিসেবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদের নাম নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

তবে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি নির্ভর করবে গোয়েন্দা প্রতিবেদন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অতীত কার্যক্রম এবং এই পদের দায়িত্ব পালনে তাদের সক্ষমতার ওপর।

আরও পড়ুন

এদিকে, আইজিপির বক্তব্য ঘিরে মঙ্গলবার রাজনৈতিক ও সরকারি পর্যায়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী এই মন্তব্যকে সরকারের জন্য ‘বিব্রতকর’ বলে অভিহিত করেন।

এসআরবি প্রধান হাবিব পলাশ

অতিরিক্ত আইজিপি আহসান হাবিব পলাশ নবগঠিত এসআরবির (সাবেক র‌্যাব) প্রথম মহাপরিচালক (ডিজি)। এর আগে তিনি র‌্যাবের সর্বশেষ ডিজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৫তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তা পলাশ ১৯৯৫ সালে এএসপি হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়া থেকে পেশাগত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তিনি।

হাসিব আজিজ

অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদায় এপিবিএনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন হাসিব আজিজ। ১৫তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের এই কর্মকর্তা ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেন।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রায় দেড় বছর দায়িত্ব পালনের পর ২০২৬ সালের মার্চে তাকে এপিবিএন প্রধান করা হয়।

সিএমপি প্রধান হওয়ার আগে তিনি সিআইডির অধীন ডিটেকটিভ ট্রেনিং স্কুলের কমান্ড্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কর্মজীবনে তিনি ইন্টারপোল ডেস্কের প্রধান, টাঙ্গাইল পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারের কমান্ড্যান্ট এবং এপিবিএন সদর দপ্তরের বিভিন্ন পদেও কাজ করেছেন।

১৯৭১ সালে শরীয়তপুরে জন্মগ্রহণকারী হাসিব আজিজ সাবেক আইজিপি এম আজিজুল হকের সন্তান; যিনি ২০০৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাও ছিলেন।

সিআইডডি প্রধান মোশাররফ হোসেন

অতিরিক্ত আইজিপি মোশাররফ হোসেন ২০২৬ সালের ২৯ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে সিআইডি প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৫তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের এই কর্মকর্তা ১৯৯৫ সালে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন। তিনি কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং যুক্তরাজ্যে আইনে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।

সিআইডি প্রধান হওয়ার আগে তিনি প্রেষণে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে পদে দায়িত্ব পালনকালেই তিনি অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি পান।

মাঠ পর্যায়ে তিনি পিরোজপুর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) ছিলেন। এছাড়া সিআইডি সদর দপ্তর এবং এর চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা ইউনিটেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি, ডিএমপি, সিএমপি, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) এবং পুলিশ সদর দপ্তরেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

২০২৬ সালের মার্চে তিনি অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি পেয়ে র‌্যাবের ডিজি হিসেবে নিয়োগ পান এবং ২৮ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে সেপ্টেম্বরে তিনি এসআরবির প্রথম প্রধান হন। র‌্যাবের দায়িত্ব নেওয়ার আগে তিনি চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপ-মহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) ছিলেন। তার আগের কর্মস্থলের মধ্যে রয়েছে ডিএমপি, সিএমপি, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ, এপিবিএন, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এবং বিভিন্ন জেলার মাঠ পর্যায়ের পদ।

রেলওয়ে পুলিশ প্রধান ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান

ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান বাংলাদেশের রেলওয়ে পুলিশের প্রধান (অতিরিক্ত আইজিপি, চলতি দায়িত্ব) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি রাজশাহীর প্রিন্সিপাল, পুলিশ সুপার, মৌলভীবাজার ও ঝিনাইদহ জেলার দায়িত্ব পালন করেছেন।

১৫ তম বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের এই কর্মকর্তা যুক্তরাজ্যের লিঙ্কনস ইন থেকে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি একজন পিএইচডি ফেলো। ১৯৯৭ ও ২০২২ সালে সালে আওয়ামী সরকার তাকে চাকরি থেকে যথাক্রমে বরখাস্ত ও বাধ্যতামূলক অবসর দেয়। পরে তাকে দেশ ছাড়তে হয়। তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad