আগামী বছর থেকে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষা প্রায় তিন মাস এগিয়ে আনার সরকারি পরিকল্পনায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেক অভিভাবক উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, শিক্ষাবর্ষের মাঝামাঝি সময়ে এসে পরীক্ষা এতটা এগিয়ে নিলে শিক্ষার্থীরা প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় পাবে না।
এই সংক্ষিপ্ত সময়সীমা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বড় ধরনের শিখন ঘাটতি তৈরি করবে কি না এমন প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
গত ১৪ মে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সাম্প্রতিক বছরগুলোর প্রচলিত এপ্রিল-মে মাসের সময়সূচির পরিবর্তে ২০২৭ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ৭ জানুয়ারি থেকে ৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে আয়োজন করার প্রস্তাব করেন। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষা চলাকালেই এই ঘোষণাটি এলো, যা গত ২১ এপ্রিল শুরু হয়েছে এবং আগামী ২০ মে পর্যন্ত চলবে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষাবর্ষের সূচিতে তিন মাস একটি দীর্ঘ সময়। শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের সময় এতটা কমে গেলে সেই ঘাটতি পূরণ করা কঠিন হবে। পাশাপাশি পাঠ্যসূচি সঠিকভাবে শেষ করা যাবে কি না তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) মাধ্যমিক শিক্ষা শাখার একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, এই প্রস্তাবের ফলে শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে এই কর্মকর্তা জানান, বাস্তবায়নের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এনসিটিবি, শিক্ষা বোর্ড, মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষকদের নিয়ে আলোচনা করা হবে।
এনসিটিবির আরেকজন বিশেষজ্ঞ জানান, এই পরিবর্তিত সময়সূচির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পাঠ্যসূচি, পাঠদান পদ্ধতি বা পরীক্ষা প্রক্রিয়ায় কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে কি না তা কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করছে। তিনি আরও বলেন, প্রস্তাবিত সময়সীমা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা কঠিন হলে পরীক্ষার তারিখ পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।
চলতি ২০২৬ সালের শিক্ষাবর্ষের সূচি অনুযায়ী, দশম শ্রেণীর প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষা আগামী ২৮ জুন থেকে ১৩ জুলাই এবং নির্বাচনী পরীক্ষা ২৮ অক্টোবর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সাধারণত নিবন্ধন ও ফরম পূরণের প্রক্রিয়া শেষ করার পর শিক্ষা বোর্ডগুলো এপ্রিল মাসে পরীক্ষা নেওয়ার জন্য জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারি মাসে এসএসসির সময়সূচি প্রকাশ করে থাকে।
শিক্ষামন্ত্রী ১৪ মে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেন, সরকার আগামী বছর থেকে জানুয়ারিতে এসএসসি এবং জুনে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। মন্ত্রী জানান শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের সময় অপচয় কমাতে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে দুটি পাবলিক পরীক্ষাই ধীরে ধীরে ডিসেম্বর মাসে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, পরিবর্তিত পরীক্ষার সময়সূচি বাস্তবায়নের আগে পাঠ্যসূচি যেন সময়মতো শেষ করা যায় তা নিশ্চিত করতে সরকার অংশীজনদের সাথে আলোচনা করছে।
অভিভাবকরা বলছেন, রাজনৈতিক কর্মসূচি, নির্বাচন সংক্রান্ত কার্যক্রম, রমজান ও ঈদের ছুটির কারণে চলতি বছর ক্লাসের পড়ালেখা বারবার ব্যাহত হয়েছে। সামনে আরও ছুটি রয়েছে। ফলে অনেকেই মনে করছেন, শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যেই বড় ধরনের একাডেমিক ঘাটতির মুখে পড়েছে।
গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার পিয়ারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বীথি আক্তার প্রশ্ন তোলেন, ‘শিক্ষার্থীরা আসলে কখন শ্রেণীকক্ষে ভালোভাবে পড়াশোনা করবে?’ তিনি বলেন, ‘আসল চাপটা পড়বে শিক্ষার্থীদের ওপর। শিক্ষকরা হয়তো কোনোভাবে পাঠ্যসূচি শেষ করে দেবেন, কিন্তু প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে শিক্ষার্থীদের সম্ভবত গৃহশিক্ষক এবং কোচিং সেন্টারের ওপরই নির্ভর করতে হবে।’
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই সংক্ষিপ্ত সময়সূচির কারণে শিক্ষার্থীদের রিভিশন ও পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য খুব কম সময় থাকবে। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনী পরীক্ষার পর শিক্ষার্থীরা সাধারণত বোর্ড পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতিমূলক ক্লাস পায়। এবার সেই সুযোগ একেবারেই থাকবে না।’
তবে তিনি আরও বলেন, নবম শ্রেণী থেকে শুরু করে সমন্বিত দুই বছরের পরিকল্পনা নিয়ে শিক্ষাবর্ষের সূচি নতুনভাবে সাজানো হলে ভবিষ্যতে ডিসেম্বর মাসে এসএসসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হতে পারে।
রংপুরের পীরগঞ্জের আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের আরেকজন প্রধান শিক্ষক প্রস্তাবিত সময়সূচির কারণে শিক্ষা বোর্ডগুলোর প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, স্কুলগুলোর নির্বাচনী পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করতে সাধারণত ১০ থেকে ১২ দিন সময় লাগে। এরপর এসএসসির ফরম পূরণের জন্য আরও ৭ থেকে ১০ দিন প্রয়োজন হয়। পরে ফরম যাচাই-বাছাই ও চূড়ান্ত করতে লাগে আরও ৫ থেকে ৭ দিন।
তিনি বলেন, ‘ফরম পূরণের পর পরীক্ষা আয়োজনের আগে সব প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে শিক্ষা বোর্ডগুলোর সাধারণত অন্তত দুই মাস সময় লাগে। পরীক্ষা এত দ্রুত এগিয়ে আনা হলে সবকিছুতেই এক ধরনের তাড়াহুড়ো তৈরি হবে।’
সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত মাধ্যমিক শিক্ষা উন্নয়ন বিষয়ক পরামর্শক কমিটির প্রধান ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞ মনজুর আহমেদ এত দ্রুত পরীক্ষা এগিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, এত দ্রুত পরীক্ষা এগিয়ে আনার কোনো জরুরি প্রয়োজন ছিল না।
মনজুর আহমেদ সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই পরিবর্তিত সময়সূচি শিক্ষার্থীদের জন্য শিখন ঘাটতি তৈরি করতে পারে। তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতির মুখে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। কেবল পরীক্ষা নেওয়ার চেয়ে শ্রেণীকক্ষে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমি আশা করি সরকার সেদিকেই মনোযোগ দেবে।’
যোগাযোগ করা হলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আব্দুল খালেক জানান, অংশীজনদের সাথে আলোচনার পরেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। এ বিষয়ে আমার নতুন কিছু বলার নেই।’
তবে পরীক্ষা প্রায় তিন মাস এগিয়ে আনার কারণে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ও সম্ভাব্য শিখন ঘাটতি নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগ নিরসনে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা আছে কি না জানতে চাইলে সচিব মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।


