বাংলাদেশে লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজার এখন লাগামহীন। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে এলপিজি কিনতে বাধ্য হচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা। সম্প্রতি গ্যাসের দাম আরও এক দফা বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক পরিবার এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর নাগালের বাইরে চলে গেছে ১২ কেজির সিলিন্ডার।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) চলতি মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করেছে। তবে খুচরা বাজারে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
গ্রাহকরা জানিয়েছেন, তাদের প্রতিটি সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে দুই হাজার ১০০ টাকা বা তারও বেশি দামে। সরকারি দামের সঙ্গে বাজারের এই বিশাল ব্যবধান দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভোক্তাদের মতে, বারবার দাম বৃদ্ধি এবং প্রশাসনের দুর্বল তদারকির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
আজিমপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ আব্বাস বলেন, কয়েকদিন আগেও সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৬০০ টাকার মতো, যা এখন ২ হাজার টাকা ছাড়িয়ে গেছে। তার মতো সাধারণ পরিবারের পক্ষে এই খরচ মেটানো এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
আরেকজন ভোক্তা মোহাম্মদ রনি বলেন, তাদের মাসিক আয় খুবই সীমিত। গ্যাসের দাম এভাবে বাড়তে থাকলে আগামী মাসে সিলিন্ডার কেনার সামর্থ্য তাদের থাকবে না। এর ফলে তারা এলপিজি ব্যবহার ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন।
এদিকে এলপিজির অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধিতে সংকটে পড়েছেন রাস্তার পাশের ক্ষুদ্র দোকানদাররা।
হাতিরপুলের চা বিক্রেতা দুলাল হোসেন জানান, বাড়তি দামের কারণে তার ব্যবসার মুনাফা কমে যাচ্ছে। তিনি হঠাৎ করে চায়ের দাম বাড়িয়ে দিলে গ্রাহক হারাবেন, আবার বেশি দামে গ্যাস কিনে ব্যবসায় টিকে থাকাও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
এলপিজির খুচরা বিক্রেতারা এই পরিস্থিতির জন্য বাড়তি পরিবহন খরচ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার জটিলতাকে দায়ী করছেন।
লক্ষ্মীবাজারের এলপিজি বিক্রেতা মোহাম্মদ হৃদয় জানান, তাদেরকে ডিলারদের কাছ থেকেই বেশি দামে সিলিন্ডার সংগ্রহ করতে হয়। বাজারে একটি সমন্বিত খুচরা দাম বজায় রাখার কথা থাকলেও বেশি দামে কেনার কারণে তারা সরকার নির্ধারিত মূল্যে পণ্য বিক্রি করতে পারছেন না।
এদিকে বরাবরের মতোই বাজার মনিটর করার আশ্বাস দিয়েছেন বিইআরসি কর্মকর্তারা। তারা জানান, বাজারে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে অতীতেও এমন অনেক আশ্বাস দেওয়া হলেও সাধারণ মানুষের জন্য তা কার্যকর কোনো সুফল বয়ে আনেনি।
এলপিজির দাম সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করছে। গত মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের সরকারি দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা। এপ্রিলের শুরুতে তা বাড়িয়ে ১ হাজার ৭২৮ টাকা এবং সর্বশেষ তা ১ হাজার ৯৪০ টাকা করা হয়। কিন্তু সরকারি এই তালিকার চেয়ে বাজারের প্রকৃত দাম সবসময়ই অনেক বেশি।
বিইআরসি প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে। বিশেষ করে সৌদি আরামকোর প্রোপেন ও বিউটেনের দামের ওপর ভিত্তি করে এই মূল্য নির্ধারিত হয়। এর সাথে ডলারের বিনিময় হার এবং আমদানি খরচ যুক্ত করে স্থানীয় মূল্য ঘোষণা করা হয়।
দেশে সরকারিভাবে সরবরাহ করা সাড়ে ১২ কেজি ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের দাম মাত্র ৮২৫ টাকা হলেও এর সরবরাহ খুবই সীমিত।
অন্যদিকে গাড়িতে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও প্রতি লিটার ৭৯ টাকা ৭৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮৯ টাকা ৫০ পয়সা করা হয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে জ্বালানি খাতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে।


