জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন থানা ও গণভবন থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ এখনো উদ্ধার না হওয়ায় জননিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এক হাজার ৩৩০টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৮৯ রাউন্ড গুলি এখনো দুর্বৃত্তদের হাতে রয়েছে। এই বিপুল অবৈধ অস্ত্র আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বড় ধরনের সহিংসতার কাজে ব্যবহারের আশঙ্কা করা হচ্ছে। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো অভিযান জোরদারের কথা বললেও দৃশ্যত সফলতার হার খুবই কম।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত বছরের ১০ আগস্ট স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ পুরস্কার ঘোষণা করেন। সেই ঘোষণা অনুযায়ী, একটি লাইট মেশিনগান বা এলএমজি উদ্ধারের তথ্য দিলে সন্ধানদাতা পাঁচ লাখ টাকা, সাব মেশিনগানের জন্য দেড় লাখ, চায়না রাইফেলের জন্য এক লাখ এবং পিস্তল ও শটগানের তথ্যের জন্য ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার পাওয়ার কথা। এছাড়া প্রতি রাউন্ড গুলির জন্য ৫০০ টাকা পুরস্কার নির্ধারণ করা হয়।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার এই ঘোষণার সময় পুলিশের নিখোঁজ অস্ত্রের সংখ্যা ছিল এক হাজার ৩৭৫টি এবং গোলাবারুদ ছিল ২ লাখ ৫৭ হাজার ৮৪৯টি। তবে পুরস্কার ঘোষণার পর থেকে গত নভেম্বর মাস পর্যন্ত মাত্র ৪৫টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ১৯০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আন্দোলনের সময় দেশের বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও পুলিশি স্থাপনা থেকে মোট ৫ হাজার ৭৫৩টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছিল। এর মধ্যে গণভবন ও সংসদ ভবন থেকে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) ৩২টি অত্যাধুনিক অস্ত্রও খোয়া যায়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাছে ৪৯ হাজার ৫০০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও কাঁদানে গ্যাস মজুদ ছিল। ২০২৪ সালের ৫ ও ৬ আগস্টের সহিংসতায় ডিএমপির এক হাজার ৮৯৮টি অস্ত্র লুট হয়। ওই সময় ৯১টি পুলিশ ফাঁড়ি ও ২১টি থানাসহ মোট ১২১টি স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। এর মধ্যে বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলসহ ১৩টি থানায় অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
সর্বশেষ গত ডিসেম্বরে সারা দেশে ১৫৯টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪১টি অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে। এছাড়া রাজশাহী বিভাগ থেকে ২৪টি, খুলনা বিভাগ থেকে ২১টি এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ১৬টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে। ওই মাসে গুলি উদ্ধার হয়েছে মাত্র ৩৪ রাউন্ড। চলতি জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে আরও ছয়টি অস্ত্র উদ্ধার হলেও সেগুলো লুণ্ঠিত তালিকার কি না, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত নয় পুলিশ সদর দপ্তর।
নির্বাচন স্থগিত চেয়ে রিট
লুট হওয়া এসব অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্থগিত চেয়ে বুধবার হাইকোর্টে রিট করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান। রিটে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব ও আইজিপিসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়েছে।
রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয়, পাঁচ হাজার ৭৫০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৬ লাখ ৫১ হাজার ৬০৯ রাউন্ড গোলাবারুদ লুট হওয়ার তথ্য গণমাধ্যমে এসেছে। এত অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে থাকায় ভোটার ও প্রার্থীদের জীবন চরম হুমকির মুখে পড়েছে। সম্প্রতি ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী শরীফ উসমান হাদীর গুলিতে নিহতের ঘটনা এই আশঙ্কারই প্রমাণ দেয়।
রিটে আরও বলা হয়, জনগণের ‘জীবনের অধিকার’ নিশ্চিত না করে নির্বাচনের আয়োজন করা সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ নিজেও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারকে জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন। এমতাবস্থায় নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ভোট গ্রহণ স্থগিত রাখার আবেদন জানানো হয়েছে।


