মুঘল রাজধানী ১৬১০ সালে ঢাকায় স্থানান্তরিত হওয়ার পর থেকেই জলদস্যুদের ক্রমাগত উপদ্রব নগরীর শাসকদের জন্য এক স্থায়ী উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ সময় পর্তুগিজ ও মগ জলদস্যুদের ধারাবাহিক আক্রমণে নগরবাসী সব সময় আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাতেন। উপকূলীয় অঞ্চল থেকে নৌকাযোগে মেঘনা নদী পাড়ি দিয়ে তারা ধলেশ্বরী নদীর মোহনায় পৌঁছাত। সেখান থেকে ডান দিকে মোড় নিয়ে প্রবেশ করত শীতলক্ষ্যা নদীতে। সুলতানি আমলে লুট করার জন্য সোনারগাঁও ছিল তাদের অন্যতম লক্ষ্য। তবে ঢাকায় মুঘল রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সোনারগাঁওয়ের প্রতি তাদের আগ্রহ ক্রমশ কমে আসে।

পজলদস্যুদের এই ভয়াবহ আগ্রাসন প্রতিহত করে ঢাকাকে সুরক্ষিত রাখতে সপ্তদশ শতাব্দীতে গড়ে তোলা হয় এক ত্রিভুজাকৃতির প্রতিরক্ষা বলয়। সেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল তিনটি জলদুর্গ, যার মধ্যে হাজীগঞ্জ দুর্গ অন্যতম। মুঘল স্থাপত্যশৈলীর এই অনন্য নিদর্শন আজ কালের বিবর্তনে ও দীর্ঘদিনের অবহেলায় হারাতে বসেছে তার ঐতিহাসিক সৌন্দর্য ও গৌরব। দুর্গের আশপাশের জমি প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দখলে চলে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। একসময় যে পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে শত্রুর গতিবিধির ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখা হতো, বর্তমানে সেখান থেকেই খসে পড়ছে ইট। দেয়ালের প্লাস্টারের বড় বড় অংশ ভেঙে গেছে। দুর্বৃত্তরা অনেক আগেই দুর্গের প্রবেশদ্বারটি খুলে নিয়ে গেছে। নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় যে কেউ যেকোনো সময় দুর্গ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে পারে।
ফলে, একসময়ের দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা দুর্গ এখন পরিণত হয়েছে মানুষের আড্ডাস্থল ও শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার প্রাঙ্গণে। সময়ের পরিহাসে গরু-ছাগলের অবাধ বিচরণেও ব্যাহত হচ্ছে এর ঐতিহাসিক মর্যাদা। প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে বহু দর্শনার্থী ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি দেখতে আসেন। কিন্তু এর জরাজীর্ণ অবস্থা দেখে তারা ভারাক্রান্ত মনেই ফিরে যান।

অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত প্রায় ৪৫০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক সোনাকান্দা দুর্গও বর্তমানে বর্জ্যের স্তূপ, দুর্গন্ধ ও অব্যবস্থাপনার কারণে সংকটের মুখে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দুর্গের ভেতরে ও আশপাশে জমে থাকা আবর্জনা শুধু পরিবেশের ক্ষতিই করছে না, বরং এর নান্দনিক সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যগত মূল্যবোধকেও ক্ষুণ্ন করছে।
ইতিহাসবিদদের মতে, সোনাকান্দা দুর্গ সপ্তদশ শতাব্দীর পূর্বে নির্মিত তিনটি নদীকেন্দ্রিক দুর্গের অন্যতম। ধারণা করা হয়, জলদস্যুদের লুটতরাজ ও আক্রমণ প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে বাংলার সুবেদার মীর জুমলার শাসনামলে ১৬৬০ থেকে ১৬৬৩ সালের মধ্যে দুর্গটি নির্মিত হয়েছিল।

সোনাকান্দা দুর্গকে ঘিরে স্থানীয় জনপদে ছড়িয়ে আছে নানা কিংবদন্তি ও লোককথা। স্বর্ণময়ী কিংবা সোনা বিবিকে ঘিরে প্রচলিত কাহিনিগুলো দুর্গটির ইতিহাসে যোগ করেছে এক রহস্যময় মাত্রা। এ ছাড়া দুর্গটির সঙ্গে লালবাগ কেল্লার সংযোগ স্থাপনকারী একটি কথিত গোপন সুড়ঙ্গের গল্পও দীর্ঘদিন ধরে লোকমুখে প্রচলিত। ইতিহাস, কিংবদন্তি আর রহস্যের এমন মেলবন্ধন সোনাকান্দা দুর্গকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র আকর্ষণ।

হাজীগঞ্জ কিংবা সোনাকান্দা, দুর্গ দুটির দিকে তাকালে মনে হয়, ইতিহাস কখনো কেবল অতীতের পাতায় বন্দি থাকে না; তা বেঁচে থাকে প্রাচীন ইটের গায়ে, ক্ষয়ে যাওয়া দেয়ালে, নীরব প্রাচীরের গভীরে। অথচ যথাযথ সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেই ইতিহাসই আজ ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। যে দুর্গগুলো একদিন শত্রুর হাত থেকে জনপদকে রক্ষা করেছিল, এখন সেগুলোকেই রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব।
সময়ের কাছে হার মেনে নীরবে ক্ষয়ে যাচ্ছে ইতিহাসের এই অমূল্য সম্পদ। অথচ একটু যত্ন, সচেতনতা ও যথাযথ উদ্যোগই পারে তাদের অতীতের মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে। কারণ, একটি দুর্গের পতন কেবল কিছু ইট-পাথরের অবক্ষয় নয়; তা একটি জনপদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও শেকড় হারানোরই অনুরূপ।


