উপদেষ্টা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগ ব্যর্থ হচ্ছে। কারণ, আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশে নীতিমালা জারির এক বছরেও কোন উপদেষ্টার সম্পদের হিসাব প্রকাশ পায়নি। এছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব প্রদানে নির্ধারিত সময়ের সাত পার হলেও যাচাই বাচাই করে হিসাব প্রকাশের কোন উদ্যোগ নেই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশিত না হওয়ার নেপথ্যে প্রকৃত উদ্যোগ ও প্রক্রিয়াগত ত্রুটি, আইনের বাধ্যবাধকতা না থাকার পাশাপাশি অনেকের ‘জ্ঞাত আয় বর্হিভূত সম্পদই’ হচ্ছে অন্যতম কারণ।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি প্রতিরোধ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে সম্পদের হিসাব বিবরণী জমা দিতে গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। কয়েকবার মেয়াদ বাড়িয়ে হিসাব জমা দেওয়ার শেষ দিন ধার্য ছিল গত ১৫ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু আওতাধীন দপ্তরগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দিলেও গত সাত মাসেও তা যাচাই বাছাই শুরু করেনি।
এছাড়া সরকারের উপদেষ্টা বা সমমার্যদা সম্পন্নদের আয় ও সম্পদ বিবরণী প্রকাশে গত বছরের ১ অক্টোবর একটি নীতিমালা জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। ওই নীতিমালায় প্রতিবছর আয়কর রিটার্ন জমা দেয়ার সবশেষ তারিখের ১৫ দিনের মধ্যে মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের মাধ্যমে উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দিতে বলা হয়। কিন্তু উপদেষ্টাদের সম্পদের হিসাব এখনো মন্ত্রী পরিষদ বিভাগেই আছে।
সূত্র মতে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশের উদ্যোগে আশাবাদী হওয়া অনেকেই এখন এখন হতাশ।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘সরকারের উদ্যোগ ইতিবাচক ছিল; কিন্তু তা বাস্তবায়ন না হওয়া হতাশাজনক।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি চাকরি আইন-২০১৮ এবং ১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালায় কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়া বিধান থাকলেও কিন্তু জনগণের জানার সুযোগ সীমিত। যে কারণে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলাদের দুর্নীতির বিষয়টি সামনে আসায় একজন আইনজীবী এ বিষয়ে পদক্ষেপ রিট করলে গত বছরের ২ জুলাই উচ্চ আদালত সম্পদের হিসাব বিবরণী দাখিল ও প্রকাশ সংক্রান্ত বিধিমালা বাস্তবায়নে কঠোর নির্দেশ দেন।
এর এক মাস পর সরকারের পতন হলে অন্তর্বর্তী সরকার প্রধানের দায়িত্ব নিয়ে ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুস ভাষণে বলেন, ‘সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিারো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। সব উপদেষ্টা দ্রুত সময়ে সম্পদের হিসাব বিবরণ প্রকাশ করবেন। এটি সরকারি সব কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও বাধ্যতামূলক করা হবে। এক্ষেত্রে সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদে প্রতিশ্রুত ন্যয়পাল নিয়োগে অধ্যাদেশ প্রনয়ন করা হবে।’
এরপরই উপদেষ্টাদের সম্পদক প্রকাশে নীতিমালা এবং কর্মকর্তাদের জন্যে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণীর জমাদানের তথ্য
মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ জানিয়েছে, প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বাধীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে মন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টা রয়েছেন ২২ জন। উপদেষ্টা (মন্ত্রী) পদমর্যাদায় তিনজন এবং প্রতিমন্ত্রী মর্যাদায় সাত জন বিশেষ সহকারি রয়েছেন।
মন্ত্রী সেবা শাখার উপসচিব এ এস এম ইবনুল হাসান ইভেন বলেন, ‘উপদেষ্টারা সবাই সম্পদের হিসাব জমা দিয়েছেন। কিন্তু নির্দেশনা না পাওয়ায় এখনো প্রধান উপদেষ্টার কাছে পাঠানো হয়নি।’
মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার টাইমস অব বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, তিনি তার সম্পদের হিসাব যথাসময়ে মন্ত্রী পরিষদ বিভাগে জমা দিয়েছেন।
স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সচিব ভুঁইয়া গত ১৫ আগস্ট একটি বিদেশি গণমাধ্যমে বলেন, তিনি উপদেষ্টা হওয়ার আগে ছাত্র থাকায় তার কোন আয় ছিল না বলে ক্যাবিনেট বিভাগকে জানিয়েছিলেন। চলতি বছরের আয় ও সম্পদের রিটার্ন জমা দেওয়ার সবশেষ তারিখের পরপরই তিনি জমা দেবেন।
তিনি জানান, তবে অন্যান্য উপদেষ্টারা তাদের গত বছরের আয় ও সম্পদের হিসাব হিসাব জমা দিয়েছেন।
কর্মকর্তাদের হালচাল
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ৩০ জুন প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী সংখ্যা হচ্ছে– ১৪ লাখ ৫০ হাজার ৮৯১ জন।
পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের উপ-পরিচালক (প্রশাসন) মহিদুর রহমান মোল্লা জানান, প্রতিষ্ঠানটির ৫৫৩ জনের মধ্যে ৫৫২ জন কর্মকর্তাই তাদের হিসাব জমা দিয়েছেন। সমবায় অধিদপ্তরের অতিরিক্ত নিবন্ধক আহসান কবীর বলেন, ‘শ দুয়েক কর্মকর্তার পদ থাকলেও কয়েকটি শুন্য রয়েছে। এখানকার ১৮০ জনের উপরে সম্পদের হিসাব জমা দিয়েছেন।’
মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন দপ্তরে গিয়ে জানা গেছে, কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে হিসাব জমা দিয়েছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বলছে, তাদের ৬ হাজার ৫৪৮ কর্মকর্তার মধ্যে ৬ হাজার ৫২৫ জন হিসাব জমা দেন। কিন্তু বিপরীতে বেশিরভাগ মন্ত্রণালয়ে কতজন জমা দিয়েছেন তার সম্পূর্ন চিত্র জানা যাচ্ছে না।
তবে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মো. মোখলেস উর রহমান বলেন, ‘প্রজ্ঞাপনের পর প্রতিবছর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সবাইকে হিসাব জমা দিতে হবে। তখন জনপ্রশাসনকে আর কিছু করতে হবে না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগই যাচাই-বাছাই করে ফেলবে বলেও আশাবাদ তার।’
কেন বাস্তবায়ন হচ্ছে না
সরকারের এ ইতিবাচক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন না হওয়ার নেপথ্যে জানা গেছে, বেশিরভাগ কর্মকর্তা তাদের আয় বা সম্পদের হিসাব প্রকাশে অনিহা প্রকাশ করেন। ‘জ্ঞাত আয় বর্হিভূত সম্পদ’ প্রকাশের ভয়েও বিষয়টি সবার সামনে আনতে চান না, এমন অনেকেও আছেন।
এছাড়া সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করলেও ‘আইনের বাধ্যবাধকতা’ না থাকায় অনেক সম্পদের হিসাব জমা দেন না।
দৃশ্যত, এসব কারণেই ওই সরকারের উদ্যোগ বাস্তবায়নে কোনো গতিশীলতা নেই।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন- ‘কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব লুকানোর কারণ হচ্ছে- তাদের অনেকের বৈধ আয়ের চেয়ে সম্পদ বেশি। অর্থাৎ অবৈধ সম্পদ রয়েছে। কোন কিছু লুকানো মানেই হচ্ছে সেখানে অস্পষ্টতা রয়েছে। এবার সরকার তার কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশে যে উদ্যোগ নিয়েছিল সেটিও বাস্তবায়ন হবে বলে আশাবাদী নন তিনি।’
সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ হাবিবুল মজুমদার বলেন, ‘আগে পাঁচবছর পর পর হিসাব নেয়া হলেও আইনে বাধ্যবাধকতা না থাকায় সঠিক যাচাই করে অবৈধ সম্পদ অর্জনকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এবারো আমরা আগের মতো অবস্থা দেখছি। দুর্নীতি করে পার পেয়ে গেলে কেউ হিসাব দিতে চান না।’
আবার অনেকে বলছেন, হঠাৎ করে প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তারা কর্মচারীর সম্পদ বিবরণী যাচাই বাছাইয়ে লোকবল বা সঠিক প্রক্রিয়া নেই। তাই দ্রুত সময়ে এটি সম্ভব নয়।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত সচিব ও বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য মোঃ মহিউদ্দিন বলছেন, ‘হঠাৎ করে কোন সিস্টেম চালু করলে সেটির পরিপূর্ণতা আনা কঠিন। সিস্টেম আগে থেকে চালু থাকলে কোনকিছুই অসম্ভব নয়।’


