ঈদুল ফিতরের ছুটি শেষে আবারও চট্টগ্রাম নগরীতে জ্বালানি তেলের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। নগরীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, কোথাও সীমিত বিক্রি আবার কোথাও পাম্প বন্ধ রাখার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন মোটরসাইকেল চালকেরা।
মঙ্গলবার নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ পেট্রোল পাম্পে সকাল থেকেই বাইকারদের দীর্ঘ সারি। অনেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাচ্ছেন না। কোথাও আবার নির্ধারিত সীমার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না।
পাঁচলাইশ-মুরাদপুর সড়কের হাজী ইউনুস অ্যান্ড কোং পেট্রোল পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, গেট বন্ধ। সেখানে কথা হয় জোবায়ের হোসেন নামে এক যুবকের সঙ্গে। তিনি রিকশায় করে বোতল নিয়ে তেল কিনতে এসেছিলেন, কিন্তু পাম্প বন্ধ থাকায় হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হয় তাকে।

ওই পাম্পের ব্যবস্থাপক ইব্রাহীম খলিল বলেন, ‘অনেক জায়গায় তেল নেই, তাই আমাদের পাম্পে চাপ বেড়েছিল। কিন্তু আমরা যে পরিমাণ তেল পেয়েছিলাম, তা দ্রুত শেষ হয়ে গেছে। সে কারণে সকাল থেকে পাম্প বন্ধ রাখতে হয়েছে।’
নগরীর ষোলশহর, দামপাড়া, লালখান বাজার ও সিআরবি মোড় ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে। ষোলশহর এলাকার ফসিল পেট্রোল পাম্প, দামপাড়ার পুলিশ লাইন্স পাম্প, লালখান বাজারের এস কে কাহম এবং সিআরবি মোড়ের ফোর স্টার পাম্পেও তেল পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
অন্যদিকে, বায়েজিদ রোডের বেবী সুপার মার্কেটের বিপরীতে সেনা কল্যাণ পেট্রোল পাম্পে গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে প্রতি মোটরসাইকেলে ২০০ টাকার বেশি অকটেন দেওয়া হচ্ছে না। এতে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক বাইকার প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিতে পারছেন না।

ভোগান্তির কথা জানিয়ে এক আইনজীবী বলেন, আমি পেশাগত কাজ শেষে এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এভাবে সময় নষ্টের কোনো মূল্যায়ন আছে কি? সরকার চাইলে তেলের দাম বাড়াতে পারে, কিন্তু এই দীর্ঘ লাইনের সমস্যার সমাধান করা দরকার।
সিন্ডিকেটের অভিযোগ তুলে এক বাইকার বলেন, ‘কিছু অসাধু চক্র বারবার পাম্প থেকে তেল নিয়ে বাইরে বেশি দামে বিক্রি করছে। সরকার যদি এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, তাহলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে। এখন আমরা তেল সংকটে খুব কষ্টে আছি।’
পাম্প মালিক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত সরবরাহ কমে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ডিপো থেকে ‘রেশনিং’ পদ্ধতিতে জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতিদিন কোন ডিলার কতটুকু তেল পাবে, তা কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় সংকট আরও প্রকট হচ্ছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্ট ও পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মঈন উদ্দিন জানান, চট্টগ্রাম বিভাগে আমাদের আওতায় ১৯৩টি পাম্প রয়েছে, এর মধ্যে ৪৫টি নগরীতে। কোনো পাম্প পুরোপুরি বন্ধ নেই, তবে যে পাম্প যতটুকু তেল পাচ্ছে, সেটুকুই বিক্রি করছে।
তিনি আরও বলেন, ‘চট্টগ্রাম নগরীতে অকটেনের চাহিদা বেশি, অন্যদিকে বন্দর এলাকায় ডিজেলের চাহিদা বেশি। এ কারণে শহরের পাম্পগুলোতে অকটেনের স্বল্পতা তৈরি হচ্ছে।’
সংশ্লিষ্টরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে দেশের বাজারেও।

এর আগে অতিরিক্ত চাহিদা নিয়ন্ত্রণে রাখতে গত ৬ মার্চ থেকে জ্বালানি বিক্রিতে সীমা নির্ধারণ করেছিল সরকার। পরে ঈদ সামনে রেখে ১৪ মার্চ সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়।
ঈদের আগে কয়েকদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও ছুটি শেষে আবারও তেলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকদের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই ভোগান্তি অব্যাহত থাকতে পারে। তবে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরবরাহ বাড়ানো ও বাজার তদারকি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।


