বিগত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কোনোটিই বাস্তবসম্মত ছিল না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তিনি অভিযোগ করেছেন, অতীতের প্রকল্পগুলো মূলত স্বজনতোষী ও পৃষ্ঠপোষকতা-নির্ভর ছিল, যেখানে বাস্তবতা, কার্যকারিতা এবং টেকসই উন্নয়নের বিষয়গুলোকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
বুধবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি ভবনে ২০২৫-২০৩০ মেয়াদের ‘পাঁচ বছরের কৌশলগত কাঠামো’ প্রণয়ন নিয়ে উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রী ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিতুমীর আরও বলেন, বিগত সরকারের আমলে এমন একটি প্রকল্পও খুঁজে পাওয়া কঠিন, যা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার বাইরে সম্পূর্ণ বাস্তবায়নযোগ্যভাবে গ্রহণ করা হয়েছে।
পূর্ববর্তী সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে উপদেষ্টা জানান, এ বিষয়ে ইতোমধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি আগামী বছরের জুন মাসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন জমা দেবে এবং সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতেই চলমান প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা হবে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় একটি মৌলিক পরিবর্তন আনা অপরিহার্য। আগের পরিকল্পনাগুলো ছিল সরকারের একক বিনিয়োগ-নির্ভর, যেখানে বেসরকারি খাতের সঙ্গে সমন্বয়ের ব্যাপক অভাব ছিল। নতুন পরিকল্পনায় রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি বিনিয়োগের মধ্যে কার্যকর যোগসূত্র স্থাপনের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হবে।
ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কৌশলের মূল ভিত্তি হবে ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ’। উপদেষ্টা তিতুমীর বলেন, এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে যেখানে উন্নয়নের সুফল সমাজের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছাবে। একইসঙ্গে নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করা হবে যাতে বিনিয়োগকারীরা আস্থার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করতে পারেন।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে কার্যকর হতে যাওয়া ‘পাঁচ বছরের কৌশলগত সংস্কার ও উন্নয়ন কাঠামো (২০২৬-২০৩০)’ উপস্থাপন করা হয়। এর প্রধান লক্ষ্য হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।
এই কাঠামো অনুযায়ী বেসরকারি খাতকে প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে, যোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, পুরো পরিকল্পনাটি তিনটি ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রথম ধাপ ‘পুনরুদ্ধার’ (ছয় মাস), যেখানে বিনিময় হার যৌক্তিকীকরণ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার মাধ্যমে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা হবে।
দ্বিতীয় ধাপ ‘পুনর্বিন্যাস’ (এক বছর), যার মাধ্যমে আর্থিক খাত পুনর্গঠন ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন বাড়ানো হবে। তৃতীয় ও চূড়ান্ত ধাপ হলো ‘পুনর্গঠন’ (পাঁচ বছর), যেখানে শিল্পের বহুমুখীকরণ এবং সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) তাদের উপস্থাপনায় জানায়, ২০২৬ সালে ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি দিয়ে যাত্রা শুরু করে ২০৩০ সালের মধ্যে তা ৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।
একই সময়ে মূল্যস্ফীতি বর্তমানের উচ্চমাত্রা থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। বিনিয়োগের হার জিডিপির ৩০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশে এবং রাজস্ব ঘাটতি ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া ব্যবসা সহজীকরণের লক্ষ্যে কোম্পানি নিবন্ধন ৪৮ ঘণ্টা এবং কর্মসংস্থানের অনুমতি ৭ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার মতো বৈপ্লবিক প্রশাসনিক সংস্কারের কথা জানানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নতুন এই কৌশলগত কাঠামো দেশের অর্থনীতিকে একটি স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব পথে নেওয়ার সমন্বিত রূপরেখা। তবে এর পূর্ণ সফলতা নির্ভর করবে নীতির ধারাবাহিকতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।


