আসন্ন নির্বাচনে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়বে: গবেষণা

আসন্ন নির্বাচনে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়বে: গবেষণা
শনিবার দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে গণমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

আগের নির্বাচনগুলোর চেয়ে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বেশি এবং তা মোকাবিলার প্রস্তুতি অপ্রতুল বলে আশঙ্কা করছেন সাংবাদিকেরা। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইট পরিচালিত এক গবেষণায় এ আশঙ্কা করা হয়েছে।

শনিবার দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে গণমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে গবেষণার মূল ফলাফল উপস্থাপন করেন ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী।

‘হাই রিস্ক, লো প্রিপেয়ার্ডনেস: জার্নালিস্ট সেফটি ইন ২০২৬ ইলেকশন’ শিরোনামের এই গবেষণায় ১৯টি জেলার ২০১ জন সাংবাদিকের ওপর জরিপ চালানো হয় এবং ১০টি ইনডেপথ সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।

জরিপে অংশ নেওয়া সাংবাদিকদের ৮৯ শতাংশ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহের সময় তারা শারীরিক আক্রমণ বা মারধরের শিকার হতে পারেন। ৭৬ শতাংশ সাংবাদিক মৌখিক হয়রানি এবং ৭১ শতাংশ ভীতি প্রদর্শনকে প্রধান ঝুঁকি বলে মনে করেন। নারী সাংবাদিকদের জন্য এই ঝুঁকি আরও বেশি; তাদের ৫০ শতাংশ যৌন হয়রানি এবং ৪০ শতাংশ যৌন আক্রমণ হবে বলে আশঙ্কা করেছেন।

ডিজিটাল হয়রানি বাড়ার আশঙ্কা

গবেষণায় আরও বলা হয়, নির্বাচন কভার করার সময় শারীরিক হুমকির পাশাপাশি ডিজিটাল হয়রানিও বাড়ার আশঙ্কা করছেন জরিপে অংশ নেয়া সাংবাদিকেরা। ৭৫ শতাংশ সাংবাদিক বলেছেন তাদের বা তাদের সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে অপতথ‍্য বা ডিসইনফরমেশন ছড়ানোর আশঙ্কা বেশি এবং ৬৫ শতাংশের কাছে হ্যাকিং একটি বড় ঝুঁকি।

নারী সাংবাদিকেরা অনলাইনে হয়রানি ও নজরদারি নিয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। উত্তরদাতাদের অর্ধেকেরও বেশি মনে করেন, তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করার উদ্দেশ্যে মানহানিকর প্রচারণাও চালানো হতে পারে।

বেশিরভাগ সংবাদমাধ্যমেরই এই ঝুঁকি মোকাবিলার জন‍্য যথেষ্ট প্রস্তুতি নেই। জরিপের ফল বলছে, নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা কাঠামো তাদের প্রতিষ্ঠানে নেই।

মাত্র ২৪ শতাংশ উত্তরদাতা তাদের নিয়োগকর্তার কাছ থেকে নিরাপত্তা সরঞ্জাম বা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। যদিও তা যথেষ্ট নয়। ৭৭ শতাংশ জানিয়েছেন তাদের সংবাদমাধ্যমে ডিজিটাল নিরাপত্তা নীতিমালা নেই।

আরও পড়ুন

রাজনৈতিক দল ও কর্মীরাই ঝুঁকির উৎস

জরিপে বলা হয়েছে, ৯০ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা বলেছেন, শারীরিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল ও কর্মীরাই ঝুঁকির প্র্রধান উৎস। নারী ও আঞ্চলিক সাংবাদিকেরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোকেও উল্লেখযোগ্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

সাংবাদিকেরা মনে করছেন, রাজনৈতিক লেবেলিং (পরিচয় আরোপ করা), গণমাধ্যমের ওপর আস্থার অভাব, মব ভায়োলেন্স, ডানপন্থী শক্তির উত্থান, উগ্রবাদ, গণপিটুনি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বলতা এবং সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে ছড়ানো অপতথ্য–এবারের নির্বাচনে ঝুঁকি বাড়ার মূল কারণ।

গবেষণাটিতে নির্বাচনে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য বেশ কয়েকটি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে, যেমন: দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও ডিজিটাল নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, সংবাদমাধ্যমে সুস্পষ্ট নিরাপত্তা প্রোটোকল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, জেন্ডার-সংবেদনশীল সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং জরুরি ও আইনি সহায়তা পাওয়ার উন্নত সুযোগ।

গণমাধ্যম মালিকরা নিরাপত্তার বিষয়ে উদাসীন

অনুষ্ঠানে ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ বলেন, গণমাধ্যম মালিকরা সাংবাদিকদের শারীরিক নিরাপত্তার বিষয়ে উদাসীন। ঝুঁকির বিষয়টি জানা সত্ত্বেও এ খাতে মালিকরা বিনিয়োগ করতে তারা অনাগ্রহী, ফলে পেশাদার সাংবাদিকদের নিজেদের সহকর্মীদের নিরাপত্তা নিজেদেরই নিশ্চিত করতে হবে।

টাইমস অব বাংলাদেশের স্পেশাল অ্যাফেয়ার্স সম্পাদক এম আবুল কালাম আজাদ বলেন, একটি রাষ্ট্রে শাসনব্যবস্থা ও রাজনীতি কেমন তার ওপর সাংবাদিকদের নিরাপত্তার নির্ভর করে। অতীতের নির্বাচনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচন পর্যন্ত সাংবাদিকরা সাহস নিয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপরেও তাদের মধ্যে ভয় ও আশঙ্কা কাজ করেছে সরকারের নিবর্তনমূলক আচরণের কারণে।

যমুনা টেলিভিশনের অ‍্যাসাইনমেন্ট এডিটর রোকসানা আঞ্জুমান নিকোল বলেন, সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকদের নিয়মিতই হুমকির মুখে পড়তে হয়। নারী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকির মাত্রা আরও অনেক বেশি। তাদের থামিয়ে দিতে বা সামাজিকভাবে হেয় করতে প্রায়শই অনলাইনে হেনস্তা ও যৌন হয়রানিমূলক আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়।

সমকালের সহযোগী সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, সাংবাদিকদের হয়রানি বা হামলা যারা করে, তারা প্রায়ই রাজনৈতিক দলের সুরক্ষা পায়।

যদি রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্যে প্রতিশ্রুতি দেয় যে নির্বাচনের সময় সাংবাদিকরা বাধা বা হুমকি ছাড়াই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে, তাহলে তা সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি ভালো পদক্ষেপ হতে পারে, যোগ করেন তিনি।

আলোচনায় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বার্তাসংস্থা এএফপির ব্যুরো প্রধান শেখ সাবিহা আলম, নিউ এজের প্রধান প্রতিবেদক মুস্তাফিজুর রহমান, বিডি নিউজের প্রধান প্রতিবেদক জাহিদুল কবির, আরটিভির প্রধান বার্তা সম্পাদক ইলিয়াস হোসেন এবং একাত্তর টেলিভিশনের বিশেষ সংবাদদাতা শাহনাজ শারমিন।

ফোয়ো মিডিয়া ইনস্টিটিউটের প্রকল্প সমন্বয়ক (এশিয়া) মারিয়া পিটারসন অনলাইনে আলোচনায় যুক্ত ছিলেন।

 

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad