পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অর্ক ভাদুড়ি বলেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫ পরবর্তী সময়ে যে পুরোনো পৃথিবী গড়ে উঠেছিল, তার ভিত এখন কাঁপছে। নতুন পৃথিবী এখনো জন্মের অপেক্ষায়।
তিনি বলেন, ‘আমরা একটি বৈশ্বিক প্রতিরোধী ঢেউ বা গ্লোবাল ওয়েভ অব রেজিস্টেন্স-এর মধ্যে প্রবেশ করেছি। পুরোনো পৃথিবীর অবসান আর নতুন পৃথিবীর আগমনের এই মধ্যবর্তী সময়টি সংগ্রাম, বিশৃঙ্খলা ও একই সঙ্গে চরম সৃজনশীলতার।’
শনিবার বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রহমান সেমিনার কক্ষে আয়োজিত ‘বৈশ্বিক গণআন্দোলন অভিমুখিতা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
সভায় আরও বক্তব্য দেন লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা ঋতু এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সৈয়দ নিজার।
আলোচনার শুরুতে ২০২৪ সালের বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিচারণ করে অর্ক ভাদুড়ি বলেন, ‘সরকারি দমনপীড়নের বিরুদ্ধে লাঠি, গুলি ও টিয়ার গ্যাসের সামনে যেভাবে আপনারা বুক পেতে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই সংগ্রাম ভারতবর্ষে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে আমাদের অনেককে গভীরভাবে প্রাণিত করেছিল।’
ইউরোপসহ বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র যখন জনগণকে প্রতারিত ও বঞ্চিত করে এক সংগঠিত অপমানের চক্রে ফেলে দেয়, তখন অপমানিত মানুষের প্রতিরোধের ভাষা কেমন হবে—তা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে বা কোনো মিডিয়ার নিউজরুমে ঠিক করা যায় না। লোকজনের ক্ষোভই তা ঠিক করে দেয়।’
সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা তুলে ধরে তিনি যোগ করেন, লেনিনের সময়ে যেমন ‘ইস্ক্রা’ (পত্রিকা) ছিল, আজকের সময়ে আমাদের আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি বা ‘ইস্ক্রা’ হতে পারে সোশ্যাল মিডিয়ার দুর্দান্ত ও বৈপ্লবিক ব্যবহার।
আলোচনা সভায় রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার আন্দোলনের অর্থনৈতিক সংকট ও অগ্রাধিকার নিয়ে কথা বলেন।
তিনি বলেন, ইউরোপের সম্পদের অভাব নেই, কিন্তু সেখানকার অর্থনৈতিক বন্দোবস্তের অগ্রাধিকার বদলে গেছে। করপোরেট শক্তি, ব্যাংক-ফিন্যান্সিয়াল খাত এবং সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনকারী সমরবাদী গোষ্ঠীর হাতে রাষ্ট্রের সম্পদ লুণ্ঠন হচ্ছে।
গণমাধ্যমের দৃষ্টিভঙ্গি ও উপস্থাপনা নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, ১০-১২টি দেশে আন্দোলন হলে হয়তো এক-দুটি জায়গায় আগুন লাগে। কিন্তু গণমাধ্যম কেবল পুড়ে যাওয়া গাড়ি বা বাড়ির ছবি তুলে ধরে যেন আগুন লাগানোটাই আন্দোলনের প্রধান বিষয়। প্রেজেন্টেশনের এই মানসিকতায় বড় সমস্যা রয়েছে।
ইউরোপের সঙ্গে দেশীয় আন্দোলনের সাংগঠনিক কাঠামোগত পার্থক্য নির্দেশ করে আলতাফ পারভেজ বলেন, ‘আমাদের দেশে আন্দোলন বা সংগঠনের চিন্তাটা টপ-ডাউন বা ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া। পলিটব্যুরোর প্রধান নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী প্রতিদিন আন্দোলনের দাবি, স্লোগান ও এজেন্ডা ঠিক করে দেন। অথচ ইউরোপ বা বিশ্বের অন্যান্য দেশের আন্দোলনে প্রতিনিয়ত মুখ পরিবর্তন হলেও মূল এজেন্ডা বা দাবি অপরিবর্তিত থাকে।
গণঅভ্যুত্থানে শ্রমজীবী মানুষের অবদান ও পরবর্তী অবহেলা নিয়ে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘যাত্রাবাড়ীতে যারা প্রাণ দিল, তারা এখানকার সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পর শ্রমিকদের কোনো এজেন্ডা আন্দোলনকারী, বিরোধী দল কিংবা সরকারের হাতে নেই। আমাদের সংকটটা এই সাংগঠনিক কাঠামোর।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা ঋতু বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি, সামরিক বাজেট বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সংকট তুলে ধরে বলেন, ‘ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামরিক বাজেট ৭৫ শতাংশ বেড়েছে। অথচ শিক্ষা ও সামাজিক কল্যাণ খাতে বরাদ্দ ক্রমাগত কমছে। নিও-লিবারেল বা নব্য-উদারবাদী নীতি সব কিছু বাজারের হাতে ছেড়ে দিচ্ছে, যার সবচেয়ে বড় শিকার শিক্ষার্থী ও শ্রমিকেরা।’
বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে উন্নয়ন বলতে কেবল মেট্রোরেল বা বড় উঁচু ভবন বোঝানো হয়। মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা বা মৌলিক অধিকার নিয়ে আন্দোলন করতে আমরা এখনো শিখিনি। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের এগোতে হবে। প্রকৃতপক্ষে আমরা আরেকটি অভ্যুত্থানের দিকে যাত্রা করছি এবং বর্তমানে সেই প্রস্তুতির পর্বের মধ্য দিয়েই যাচ্ছি।’


