পহেলা নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত টানা সাড়ে চার মাস পুরো পর্যটন মৌসুমজুড়েই সেন্টমার্টিন দ্বীপে রাতযাপন করতে পারবেন পর্যটকরা। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের গত ২৫ অক্টোবরের প্রজ্ঞাপনে নভেম্বর মাসে শুধু দিনের বেলায় ভ্রমণের নিয়ম থাকলেও ২৭ অক্টোবরের নতুন প্রজ্ঞাপনে সেই বিভ্রান্তি দূর করা হয়েছে।
তবে দ্বীপে যেতে প্রত্যেক পর্যটককে ১০০ টাকা ‘পরিবেশ সংরক্ষণ ফি’ দিতেই হবে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের মাধ্যমে নিতে হবে ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোডযুক্ত টিকেট।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব সাবরীনা রহমান সাংবাদিকদের জানান, নভেম্বর এবং ফেব্রুয়ারি-মার্চে দ্বীপে থাকা নিয়ে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল, তা সংশোধন করা হয়েছে। এবার নভেম্বর থেকে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত পুরো পর্যটন মৌসুমই পর্যটকরা সেন্টমার্টিনে রাতযাপন করতে পারবেন।
গত বছর শুধু ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে পর্যটকরা রাতযাপন করতে পারতেন। এছাড়া নভেম্বর এবং ফেব্রুয়ারি-মার্চে দিনে গিয়ে একই দিনে ফিরে আসতে হতো।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী জানান, সরকারের জাতীয় পর্যটন নীতিমালার আলোকে সেন্টমার্টিন ভ্রমণ নিষ্কণ্টক করতে এবং পর্যটক নিয়ন্ত্রণে ট্রাভেল পাসসহ নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
শুরু হচ্ছে না জাহাজ চলাচল
এদিকে পর্যটনের অনুমতি মিললেও জাহাজের অভাবে পহেলা নভেম্বর থেকে পর্যটকরা সেন্টমার্টিনে যেতে পারছেন না। কর্ণফুলী এক্সপ্রেস, এমভি বার আউলিয়া ও এমভি টেকনাফ—এই তিনটি জাহাজ পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেলেও এখনো বিআইডব্লিউটিএ, নৌপরিবহন অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের প্রয়োজনীয় অনুমতি পায়নি।
সী ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (স্কোয়াব)-এর সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর জানান, ভয়েজ লাইসেন্স, রুট পারমিট ও স্থানীয় অনুমতি এখনো হাতে না আসায় এবং ট্যুরিজম বোর্ডের সফটওয়্যার ওপেন না হওয়ায় জাহাজ চলাচল শুরু করতে কিছুটা সময় লাগছে।
তবে দু-একদিনের মধ্যে এ সমস্যা কেটে যাবে এবং ৫ বা ৬ নভেম্বরের দিকে জাহাজগুলো যাত্রা করতে পারবে বলে জানান হোসাইন ইসলাম বাহাদুর।
এছাড়া আগের মতোই এবারও কক্সবাজার শহরের উত্তর নুনিয়াছড়ার বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে জাহাজগুলো সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে। দৈনিক পর্যটক সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে তিন হাজার।
বিধিনিষেধ
দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় রাতের বেলা সমুদ্রসৈকতে আলো জ্বালানো, শব্দ সৃষ্টি ও বারবিকিউ পার্টি করা নিষিদ্ধ থাকবে। পাশাপাশি কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ এবং সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা যাবে না। সমুদ্রসৈকতে মোটরসাইকেল ও সি-বাইকের মতো যানবাহন চালানো নিষিদ্ধ করাসহ গত বছরের সব বিধিনিষেধ এবারও বহাল রয়েছে।
অগ্নিনিরাপত্তা
ইনানীর একটি রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনার পর সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। টেকনাফ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের স্টেশন কমান্ডার কামরুজ্জামান সুমন জানান, তিনি সম্প্রতি যোগ দিয়েছেন এবং দ্বীপ পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়জুল ইসলাম জানান, দ্বীপে স্থায়ী ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপনের সম্ভাবনা কম। তবে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে কথা বলে হোটেল ও রিসোর্টগুলোতে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, শুধু অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখলেই হবে না, বরং নিয়মিত পরীক্ষা, নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ, রান্নাঘরের নিরাপত্তা ও জরুরি বহির্গমন পথ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
দ্বীপবাসীর স্বস্তি
দীর্ঘদিন পর দ্বীপে পর্যটক যাতায়াতের সুযোগ হওয়ায় দ্বীপবাসীর মাঝে স্বস্তি ও আনন্দের আবহ ফিরে এসেছে। ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান ফয়জুল ইসলাম বলেন, পর্যটকদের আগমনকে সামনে রেখে সবাই নিজেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সংস্কারে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য কোস্টগার্ড, বিজিবি, নৌবাহিনী ও পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। তিনি আরও জানান, যে সব হোটেল-মোটেলে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি, শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


