বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময়ের ১২ বছর পার হলেও ছিটমহল কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার দাসিয়ারছড়ার বাসিন্দারা রয়েছেন নানামুখী সমস্যায়। অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও হয়নি কর্মসংস্থান। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তালাবদ্ধ অবস্থায় প্রায় তিন বছর ধরে পড়ে আছে আইটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এলাকাবাসির দাবি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালুর পাশাপাশি তারা পৃথক ইউনিয়নও চান। নাগরিক পরিচয় মিললেও জীবিকার নিশ্চয়তা, শিল্পায়ন ও মানসম্মত শিক্ষা-প্রশিক্ষণের অভাবে এখনো তারা বৈষম্যের শিকার বলে অভিযোগ তাদের।
২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে দীর্ঘ ৬৮ বছরের বন্দিদশার অবসান ঘটে দাসিয়ারছড়া ছিটমহলবাসীর। ওই দিন ১১১টি ভারতীয় ছিটমহল বাংলাদেশের সঙ্গে এবং ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহল ভারতের সঙ্গে একীভূত হয়। এর মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত হয় মুজিব-ইন্দিরা স্থলসীমান্ত চুক্তি। বহু প্রতীক্ষিত নাগরিকত্ব লাভের মাধ্যমে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন হাজারো ছিটমহলবাসী। কিন্তু এক যুগ পেরিয়ে গেলেও সেই স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েকটি সড়ক, বিদ্যুৎ ও সরকারি সেবার কিছু উন্নয়ন হলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এলাকায় এখনো গড়ে ওঠেনি উল্লেখযোগ্য কোনো ক্ষুদ্র, মাঝারি বা বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ফলে অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ, দিনমজুরি ও মৌসুমি শ্রমের ওপর নির্ভরশীল।

স্থানীয়রা জানান, সরকারি উদ্যোগে একটি আইটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু হলেও সেটি প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। এতে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন এলাকার তরুণ-তরুণীরা। তাদের দাবি, বন্ধ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র দ্রুত চালু করার পাশাপাশি কারিগরি ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক। শিক্ষাখাতেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি থাকলেও মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার বেশি। উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেক তরুণ কাজের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছুটে যাচ্ছেন।
স্থানীয়দের দাবি, অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, আধুনিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ ছাড়া ছিটমহলবাসীর জীবনমানের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়। তারা সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে এই অঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির আহ্বান জানান।
সদ্য কলেজ পাশ করা মো.মইনুল ইসলাম জানালেন তার এলাকায় অনেক শিক্ষার অভাব। বিশেষ করে কারিগরি ও আইসিটি শিক্ষার বেশ অভাব । তার দাবি, সরকার যে আইসিটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি নির্মাণ করেছে, সেটি দ্রুত চালু করার উদ্যোগ যাতে নেয়। তার মতে, এখানে নারী শিক্ষার হারও কম, তাই এই বিষয়ে অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়া দরকার।

স্কুল পড়ুয়া কাওছার জানালেন, তাদের খেলাধূলা করার মত কোনো মাঠ নেই। তাই এখানে একটি খেলার মাঠ হলে বহু তরুণ মাদকে আসক্ত হবে না।
ঢাকায় দিন মজুরের কাজ করেন মোজাফফর আলী। তিনি বলেন, ‘আমরা কাজ করতে ঢাকা যাই। এখানে তেমন কোনো কাজ নাই। দোকানপাট যা আছে তাতে লোক লাগে না। আমরা চাই এখানে একটা হলেও কলকারখানা হোক। যাতে করে আমাদের বাইরে কাজ করতে না যাইতে হয়।’
আরেক বাসিন্দা ফলজ আলী বলেন, ‘এখান থেকে কোনো কাজ করতে গেলে যাইতে হয় সেই ফুলবাড়ী। এখানে একটা ইউনিয়ন পরিষদ হলে আমাদের অফিসের কাজের আরও সুবিধা হবে।’
এই এলাকার প্রায় ছয় হাজারেরও বেশি বাসিন্দার জন্য তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। তার মধ্যে একটিতে শুধু প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। সেখানে কর্মরত চিকিৎসক মিনহাজুল ইসলাম বলেন, ‘যদি এখানে হাসপাতাল হয় তাহলে স্থানীয় মানুষজন আরও ভালো চিকিৎসা পাবে।’
সার্বিক বিষয়ে কথা হয় ফুলবাড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দিলারা আখতারের সঙ্গে। তিনি জানালেন, আইসিটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সীমাবদ্ধতার কথা। তার মতে, সরকার থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পেলেই চালু করা যাবে আইসিটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি উন্নয়ন কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া কর্মমুখী প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।


