ঢাকার উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের মর্মান্তিক ঘটনার পর কয়েক মাস কেটে গেছে। কিন্তু নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারে সেই শোক আজও বহমান, বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হতাশা ও ক্ষোভ ক্রমে গাঢ় হয়ে উঠছে। পরিবারের সদস্যরা ভেঙে পড়েছেন, আবার নতুন করে দাঁড়ানো তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় কারও গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উঠে এলেও দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ফলে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করেও সাড়া না পেয়ে নিহতদের পরিবার আরও বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তাদের অভিযোগ, বারবার দরজায় কড়া নাড়লেও নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে সঠিক প্রতিক্রিয়া মিলছে না।

এ অবস্থায় নিহত ও আহতদের পরিবারের সদস্যরা নতুন করে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন। আহত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে তারা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনার দিকে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ কর্মসূচির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এজন্য পুলিশ কমিশনারের কাছে চিঠি দিয়ে সহযোগিতাও চেয়েছেন।
গত ২১ জুলাই উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার আলী ভবনে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এফ-৭ বিজিআই যুদ্ধবিমানটি বিধ্বস্ত হয়।

ওইদিন দুপুর ১টার পর ঘটে যাওয়া এই ট্র্যাজেডিতে পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামসহ মোট ৩৬ জন প্রাণ হারান।
নিহতদের মধ্যে ছিল ২৮ শিক্ষার্থী, তিনজন নারী শিক্ষিক, তিনজন অভিভাবক এবং একজন আয়া।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, মোট ১০টি হাসপাতালে ১৬৫ জন আহত অবস্থায় ভর্তি হন।
আহত ও নিহতদের বেশিরভাগ ছিলেন শিক্ষার্থী, যারা সেদিন স্বপ্ন নিয়ে ক্লাসে গিয়েছিল, আর ফিরে গেছে সাদা কাফনে।
স্বজনদের পাঁচ দফা দাবি
দুর্ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর এসে নিহতদের পরিবার প্রধান উপদেষ্টার কাছে পাঁচটি দাবি জানিয়েছেন, নিহতদের পরিবারকে ৫ কোটি এবং আহত হলেও যারা জীবিত আছেন তাদের অন্তত ২ কোটি টাকা করে আর্থিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে।
নিহত সবাইকে শহীদি মর্যাদা দিতে হবে। আহতদের আজীবন চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব নিতে হবে। বিল্ডিং কোড না মানায় স্কুল কর্তৃপক্ষকে নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ৩ কোটি ও আহতদের পরিবারকে ১ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
নিহতদের স্মরণে স্মৃতি রক্ষায় উত্তরা এলাকায় একটি মসজিদ নির্মাণ করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

সন্তান হারানো বহু অভিভাবক অভিযোগ করেছেন, প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করার আবেদন পাঠালেও কোনো সাড়া পাননি। বরং স্কুল কর্তৃপক্ষ নিজেদের ক্ষতির কথা তুলে ধরে সরকারের কাছে আলাদা ক্ষতিপূরণের আবেদন করেছে, কিন্তু নিহতদের পরিবার নিয়ে তাদের কার্যত কোনো আগ্রহ নেই।
আশরাফুল ইসলাম ও তাহমিনা দম্পতি তাদের দুই সন্তান নাজিয়া তাবাসসুম নিঝুম ও আরিয়ান আশরাফ নাফিকে একসঙ্গে হারিয়ে প্রায় ভেঙে পড়েছেন।

তাদের একমাত্র দাবিগুলোর একটি হলো রাজাবাড়ি পুকুরপাড়ে সন্তানদের কবর স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা। কিন্তু এ বিষয়েও কোনো দপ্তর থেকে ইতিবাচক বার্তা তারা পাচ্ছেন না।
নিহত শামীমুল করিমের বাবা রেজাউল করিম জানান, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) আইনি সহায়তা দিচ্ছে এবং মামলায় তারা আনুষ্ঠানিকভাবে পক্ষ হয়ে লড়াই করবেন, যাতে দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত হয় ও ক্ষতিপূরণ আদায় করা যায়।

মাইলস্টোন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ কর্নেল (অব.) নূরন্ নবী দাবি করেছেন, হতাহতদের পরিবার সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ পেতে পারে, এমন উদ্যোগ তারা নিচ্ছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে স্বাভাবিক হয়েছে, তবে চারজন এখনো ট্রমায় ভুগছে এবং রাষ্ট্র তাদের একজনকে বিদেশে চিকিৎসায় পাঠানোর পদক্ষেপ নিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, স্কুল ভবন হারিরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের অনুমোদনে নির্মিত হয়েছে, রাজউক থেকে নয়।


