ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ভারে এখন বিপর্যস্ত দেশের সড়ক-মহাসড়ক। বিশেষ করে তীব্র যানজটের ঢাকায় মাত্রাতিরিক্ত অটোরিকশা আর এসব বাহনের বেপরোয়া চলাচল এক অসহনীয় দমবদ্ধ অবস্থা তৈরি করেছে।
অবশ্য এই সমস্যা শুধু ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রধান শহরগুলো থেকে শুরু করে জেলা ও গ্রামীণ অঞ্চল পর্যন্ত একই রকমভাবে দ্রুত বাড়ছে অটোরিকশার সংখ্যা। গ্রামীণ এলাকা থেকে প্রতিদিন হাজারো অতিরিক্ত রিকশা শহরে প্রবেশ করে। এতে আগেই ধারণক্ষমতা ফুরিয়ে যাওয়া শহরগুলোর ওপর সৃষ্টি হয় চরম চাপ। অনেক রিকশা অবাধে মহাসড়কে চলাচল করে জনজীবন ঝুঁকিতে ফেলছে।
ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা এতটাই বেড়েছে যে, কোনো একক সংস্থা এখন আর এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এর ফলে তদারকিও জটিল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে ঠিক কতগুলো ব্যাটারিচালিত রিকশা রাস্তায় চলছে, তার কোনো নিশ্চিত সংখ্যা কারও কাছে নেই। কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো না থাকায়, কর্তৃপক্ষের নাকের ডগায় খোলামেলাভাবে চলছে যন্ত্রাংশ আমদানি ও যানের সংযোজন।
ঢাকার প্রধান সড়কগুলোতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলো প্রায়ই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে দ্রুত গতির যানবাহনের পাশাপাশি চলছে। কখনো কখনো চলছে উল্টো পথে। প্রাইভেটকারের সঙ্গে এই রিকশার সংঘর্ষ এখন নিয়মিত ঘটনা।
পুলিশ এই অনিয়ম ঠেকাতে অভিযান শুরু করলে এর প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসেন রিকশাচালকরা। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
ঢাকার রাস্তায় বেশিরভাগ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার মালিক প্রভাবশালী কোনো মানুষ। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার এস এম সাজ্জাত আলী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘শুনেছি, একেকজন ব্যক্তির ১২ থেকে ২৫টি করে অটোরিকশা আছে। আমি চাই, যার রিকশা সে চালাবে। আমরা খতিয়ে দেখছি, প্রকৃত মালিক কারা।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘আমি শুনেছি, পুলিশের অনেক সদস্যও অটোরিকশার মালিক। যদি সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অটোরিকশা মালিক সমিতির নেতাদের দাবি, বিভিন্ন ভবনের মালিক, ব্যবসায়ী এবং পুলিশ সদস্যদের সম্মিলিত মালিকানায় হাজারো যানবাহন রয়েছে। অনেক মালিক কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকা দিতে নারাজ, কারণ তাদের নাম প্রকাশ হলে হয়রানির শিকার হওয়ার ভয় রয়েছে।
অটোরিকশা মালিক সমিতির সহসভাপতি মিজানুর রহমান টাইমসকে জানান, দেশে কতগুলো ব্যাটারিচালিত রিকশা আছে, তা কেউ জানে না। তবে সমিতির ধারণা, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় প্রায় ১০ লাখ অটোরিকশা আছে। এর আশপাশে আছে আরও প্রায় পাঁচ লাখ।
হাতিরঝিল, রামপুরা ও খিলগাঁওয়ের মতো এলাকাগুলো অটোরিকশা গ্যারেজের প্রধান কেন্দ্র। সরকার বা পুলিশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ডাক এলে এই এলাকাগুলো রাস্তা অবরোধের মাধ্যমে প্রথম সহিংস হয়ে ওঠে।
মালিক সমিতির নেতাদের মতে, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ এবং সাভার থেকেও প্রতিদিন বিপুল সংখ্যায় অটোরিকশা ঢাকায় ঢোকে।
গ্যারেজ মালিকরা বলছেন, ব্যাটারি বাদে প্রতিটি অটোরিকশা তৈরি করতে কমপক্ষে ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়। মানভেদে ব্যাটারিতে খরচ হয় আরও এক থেকে দেড় লাখ টাকা। চালকরা সাধারণত প্রতিদিন মালিকদের ৪৫০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া দেন।
ঢাকা এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দু হলেও অন্যান্য বড় শহরগুলোতেও দ্রুত বাড়ছে অটোরিকশা। বন্দরনগরী চট্টগ্রামে এই সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। নগরের ভেতরেই চলাচল করে প্রায় তিন লাখ অটোরিকশা। নগরীর বাইরে বৃহত্তর চট্টগ্রামে এই সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। আরেক ছোট মহানগর সিলেটের ভেতরে অটোরিকশার সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার, আশপাশের এলাকায় চলাচল করে আরও ৩০ হাজার।
সড়কে ক্রমবর্ধমান এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে অটোরিকশায় নিয়ন্ত্রণে পরিবেশবান্ধব বিকল্পের দিকে নজর দিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) একটি অটোরিকশার ডিজাইন করেছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ই-রিকশা। এগুলো বিদ্যমান অটোরিকশাকে পর্যায়ক্রমে প্রতিস্থাপন করবে। এ সংক্রান্ত সরকারি গেজেট জারি হয়েছে, এখন চলছে প্রবিধান চূড়ান্ত করার কাজ।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন) মো. সরোয়ার জানান, ই-রিকশাগুলো শিগগির উত্তরা, ধানমন্ডি ও রমনা এলাকায় চলাচল শুরু করবে। এই কার্যক্রম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যমান অটোরিকশাগুলো ধীরে ধীরে সেই এলাকা থেকে অপসারণ করা হবে।
বুয়েট-ডিজাইন করা ই-রিকশা দেখতে বর্তমান অটোরিকশার মতোই। তবে এতে উন্নত প্রযুক্তি যোগ করা হয়েছে। ই-রিকশায় যুক্ত হয়েছে হাইড্রোলিক ডিস্ক ব্রেক, পার্কিং ব্রেক, উন্নত আলো। এর গতিসীমা হবে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৩০ কিলোমিটার। একবার ব্যাটারি চার্জে এটি ৭০ কিলোমিটার চলবে, আর ব্যাটারির আয়ু হবে প্রায় ১৮ মাস। সেই ব্যাটারিও হবে পুনব্যবহারযোগ্য।
স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মাহবুবা আইরিন বলেছেন, বাসের রুটগুলোতে ই-রিকশার চলাচল সীমিত করে দেওয়া হবে।
ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার আনিসুর রহমান জানান, ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি তার জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে একটি ই-রিকশা রাখতে পারবেন। আর বাণিজ্যিক মালিকরা রাখতে পারবেন সর্বোচ্চ তিনটি।
তবে ঢাকায় যানবাহন চলাচলের অনিয়ম ঠেকাতে ও রিকশা নিয়ন্ত্রণে সরকারি কর্তৃপক্ষের কঠোর অভিযানেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। সেই অভিজ্ঞতায় হতাশা প্রকাশ করে বুয়েটের অধ্যাপক শামসুল হক মনে করেন, অটোরিকশা অপসারণের ন্যায্যতা দিতে বুয়েটের জড়িত হওয়া ‘অবাস্তব’ পরিকল্পনা। এটি বরং ই-রিকশার মুনাফাকেন্দ্রিক ব্যবসা উসকে দিয়ে ‘বিপর্যয়’ সৃষ্টি করতে পারে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ এবং বুয়েটের অধ্যাপক মো. হাদীউজ্জামান বলেন, ‘অটোরিকশা এখন শুধু জীবিকা নয়। এটি এখন লাভজনক ব্যবসা।’ তিনি বলেন, ‘ঢাকা থেকে এগুলো সরানো সহজ হবে না।’
তার মতে, ঢাকার বাইরের মানুষের জন্য প্রথমে বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করতে হবে। এ ছাড়া অটোরিকশার সুপরিকল্পিত রেজিস্ট্রেশন এবং সঠিক লাইসেন্সিংসহ চালকদের অবশ্যই প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
ঢাকাসহ সারা দেশে অটোরিকশার দ্রুত বিস্তার একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে লাখো মানুষের জীবিকা, অনিয়ন্ত্রিত পুঁজি এবং প্রভাবশালীদের মালিকানা। সরকার এখন সামাজিক অস্থিরতা বা অর্থনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টি না করে ই-রিকশা চালুর মাধ্যমে আধুনিক পরিবর্তন আনার মতো কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।


