বিশ্বব্যাপী বিনোদন জগতে সিনেমা ও টেলিভিশন প্রযোজনা কমে যাওয়া, ওটিটি ও স্ট্রিমিং ব্যবসার চাপ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে যখন বাড়ছে উদ্বেগ, তখন বিনোদন দুনিয়ায় নতুন সম্ভাবনার নাম হয়ে উঠেছে ‘ভার্টিকাল মাইক্রোড্রামা’।
স্মার্টফোনের ছোট পর্দার জন্য ধারণ করা ৯:১৬ ফরম্যাটে ৪৫ সেকেন্ড থেকে দুই মিনিটের এসব নাটকের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। চায়না,কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ভারত ও পাকিস্তানের বাজারেও নির্মাণ হচ্ছে ভার্টিকাল মাইক্রোড্রামা।
তবে একই সঙ্গে চীনে মাইক্রোড্রামা নির্মাণে এআইয়ের ব্যবহার অভিনেতা ও নির্মাতাদের জন্য নতুন সংকেতও দিচ্ছে।
লস অ্যাঞ্জেলেসের সাবেক সংগীত প্রযোজক ক্রেইগ উইলিয়ামস দুই বছর আগে শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি পুরোনো ফার্নিচার গুদামকে প্রযোজনা কেন্দ্রে রূপ দেন। তার পরিকল্পনা ছিল, মাঝে মধ্যে মিউজিক ভিডিও নির্মাণের জন্য জায়গাটি ভাড়া দিয়ে চলচ্চিত্র ব্যবসা চালিয়ে যাবেন। কিন্তু পরিকল্পনা বদলে দেয় মাইক্রোড্রামা। শুটিংয়ের চাহিদা এতটাই বেড়ে যায় যে পরে তাকে আরও দুটি স্টুডিও খুলতে হয়েছে।
‘ভার্টিক্যাল ওয়ার্ল্ড স্টুডিওস’ নামে পরিচালিত এসব স্টুডিওতে হাসপাতাল, পুলিশ স্টেশন, আদালত, নাইটক্লাবসহ বিভিন্ন সেট রয়েছে। বড় হলিউড স্টুডিও থেকে তুলনামূলক কম দামে সংগ্রহ করা এসব সেট এখন মাইক্রোড্রামা নির্মাতাদের কাছে বেশ চাহিদাসম্পন্ন।
ছোট পর্দায় বড় বাজার
মাইক্রোড্রামার সাফল্যের মূল কারণ দর্শকের বদলে যাওয়া অভ্যাস। দীর্ঘ সময় ধরে গল্প বলার পরিবর্তে এসব নাটক শুরু হয় সরাসরি উত্তেজনাপূর্ণ কোনো পরিস্থিতি দিয়ে। প্রতিটি পর্বের শেষে থাকে নতুন মোড়, যা দর্শককে পরের পর্ব দেখতে বাধ্য করে। বহু পুরোনো ‘ক্লিফহ্যাঙ্গার’ কৌশলই এখানে স্মার্টফোনের ছোট পর্দার উপযোগী করে ব্যবহার করা হচ্ছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওমিডিয়ার হিসাবে, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৬ কোটি ৬০ লাখ মাসিক সক্রিয় দর্শক মাইক্রোড্রামা দেখেছেন। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে এই খাতের আয় প্রায় ১৫০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। আগামী বছর তা বেড়ে ২০০ কোটি ডলার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের টেলিভিশন বাজারের আকার প্রায় ১২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার হলেও আগামী বছরগুলোতে প্রতিবছর প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার করে বাজার কমতে পারে। সেই জায়গাটিই দখল করছে মাইক্রোড্রামা।
মাইক্রোড্রামার দর্শকদের বড় অংশ নারী। বিশেষ করে ২৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সী দর্শকদের মধ্যে রোমান্টিক ও মেলোড্রামার জনপ্রিয়তা বেশি। তবে সায়েন্স ফিকশন, ফ্যান্টাসি ও হররের মতো ঘরানা যুক্ত হওয়ায় তরুণ পুরুষ দর্শকরাও ধীরে ধীরে এই বাজারে যুক্ত হচ্ছেন।
চীন থেকে হলিউডে
মাইক্রোড্রামার উত্থান চীনে। দেশটিতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর এই ফরম্যাট এখন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে। চীনা পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত রিলশর্ট ও গুডশর্টের মতো অ্যাপও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে।
টিকটক, ইনস্টাগ্রাম রিলস, ফেসবুক ও ইউটিউব শর্টস মাইক্রোড্রামার দর্শক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এসব প্ল্যাটফর্মে বিনা মূল্যে কয়েকটি পর্ব দেখিয়ে দর্শককে মূল অ্যাপে নেওয়া হয়। এরপর সাবস্ক্রিপশনের মাধ্যমে বাকি পর্ব দেখার সুযোগ দেওয়া হয়। মাসে সাধারণত ৮ থেকে ২০ ডলার পর্যন্ত খরচ করতে হয় দর্শককে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, হলিউডের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন এই নতুন বাজারকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এনবিসি ইউনিভার্সালের পিকক অ্যাপে ২০২৫ সালের শুরুতে ভার্টিক্যাল ভিডিও যুক্ত হয়েছে। ফক্সও ইউক্রেনভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হলিওয়াটার টেকের সঙ্গে চুক্তি করে ২০০টির বেশি ভার্টিক্যাল ভিডিও নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে।
মাইক্রোড্রামার ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন হলিউডের অভিজ্ঞ কর্মকর্তারাও। সাবেক মিরাম্যাক্স প্রধান বিল ব্লক, সাবেক এবিসি এন্টারটেইনমেন্ট চেয়ারম্যান লয়েড ব্রাউন এবং সাবেক শোটাইম প্রেসিডেন্ট জানা উইনগ্রাডে তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এই নতুন বাজারে বিনিয়োগ করছেন। এনবিসিইউনিভার্সাল ও ওয়ার্নার ব্রাদার্স টেলিভিশনের সাবেক কর্মকর্তা সুসান রোভনারও নতুন স্টুডিও ও প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মাইক্রোড্রামা নির্মাণের পরিকল্পনা করছেন।
অভিনেতাদের জন্য নতুন দরজা
হলিউডে মাইক্রোড্রামার বিস্তার অভিনেতা, লেখক, পরিচালক ও বিভিন্ন কারিগরি পেশার মানুষের জন্য নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করছে। কোভিড মহামারি এবং হলিউডের ধর্মঘটের পর নিয়মিত কাজ হারানো অনেক শিল্পী ও কলাকুশলী এই মাধ্যমে আবার কাজ পাচ্ছেন।
তবে এই নতুন বাজারের উত্থান পুরোনো হলিউডের সংকটকেও সামনে আনছে। যুক্তরাষ্ট্রে চলচ্চিত্র প্রযোজনা সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা বাড়লেও বিশ্বজুড়ে সিনেমা ও টেলিভিশন প্রযোজনা এখনো নানা চাপের মধ্যে রয়েছে।
চীনের এআই ড্রামা
তবে নতুন ট্রেন্ড জমে ওঠার আগেই মাইক্রোড্রামার ভবিষ্যৎ নিয়েই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে চীনে। দ্রুত অগ্রসরমান এআই ভিডিও প্রযুক্তি মানব অভিনেতা ও অনলাইন পারফরমারদের জায়গাও নিতে শুরু করেছে।
বাইটড্যান্সের নতুন এআই মডেল ‘সিড্যান্স ২.০’ প্রকাশের পর এই পরিবর্তন আরও দ্রুত হয়েছে।
ডেটাআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে চীনের জনপ্রিয় ভিডিও প্ল্যাটফর্ম দৌইনে শীর্ষ ১০০ অ্যানিমেটেড ড্রামার ৮৯টিই ছিল এআইনির্ভর। চায়না নেটকাস্টিং সার্ভিসেস অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম ভাগে চীনে প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার শর্ট ড্রামা প্রকাশিত হয়েছে। আগের পুরো বছরের তুলনায় এই সংখ্যা তিন গুণেরও বেশি। এর প্রায় ৯৫ শতাংশই এআই দিয়ে তৈরি বলে দাবি করা হয়েছে।
কম খরচে, কম সময়ে প্রযোজনা
এআই মাইক্রোড্রামা তৈরির সময় ও ব্যয় দুটোই কমিয়ে দিচ্ছে। সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেন ইয়াংয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তিন থেকে পাঁচ মিনিটের একটি নাটক তৈরি করতে পাঁচজনের প্রায় তিন মাস সময় লাগত। এখন একজন কর্মী এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই একই ধরনের কনটেন্ট তৈরি করতে পারেন।
প্রতি মিনিটে প্রযোজনার খরচও কমে ৬০০ থেকে ৮০০ ইউয়ানে নেমেছে, যা মানবনির্ভর প্রযোজনার খরচের প্রায় ১০ শতাংশ। একটি এআই অ্যানিমেশন প্রতিষ্ঠান শুধু মে মাসেই প্রায় ৮ হাজার এক মিনিটের শর্ট ড্রামা পর্ব প্রকাশ করেছে।
মাইক্রোড্রামা হলিউডের সংকুচিত বাজারে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের দরজা খুলে দিয়েছে। একই সঙ্গে চীনের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, এই নতুন শিল্পও প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের বাইরে নয়।
যুক্তরাষ্ট্রে এখন মাইক্রোড্রামার নির্মাণে অভিনেতা, লেখক ও পরিচালক গুরুত্বপূর্ণ শিল্প। শিল্পীদের ন্যূনতম পারিশ্রমিক, বিশ্রামের সময় ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও নতুন চুক্তি করা হয়েছে।
কিন্তু উৎপাদন ব্যয় কমানোর প্রতিযোগিতায় এআই যে খুব দ্রুত মানবশ্রমের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে, চীনের অভিজ্ঞতা তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ফলে মাইক্রোড্রামার উত্থানকে কেবল বিনোদনের নতুন ট্রেন্ড হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। দর্শকের দেখার অভ্যাস থেকে শুরু করে, অভিনয় পেশা এবং কনটেন্ট তৈরির পদ্ধতি, সবকিছুর ওপরই এর প্রভাব পড়ছে। দুই মিনিটের ছোট্ট গল্প তাই হয়ে উঠছে বিশ্বের বিনোদন শিল্প পরিবর্তনের বড় ইঙ্গিত।


