বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে আসন সমঝোতার পরও ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ঠিক আগে আগে নির্বাচনী মাঠে বাড়তে থাকা সংকটে পড়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
এনসিপির প্রচার কার্যক্রমে জামায়াতের আমির ও অন্যান্য জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনুপস্থিতি, জামায়াতের তৃণমূল কর্মীদের সহযোগিতার ঘাটতি এবং আর্থিক সংকটে ১১ দলীয় জোটের ভেতরে অসন্তোষ বাড়ছে।
বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনের বিদ্রোহী প্রার্থী এবং জামায়াতের ‘দ্বিমুখী আচরণ’ দলটির প্রচার কার্যক্রম আরও কঠিন করে তুলেছে বলে মনে করছে দল।
এনসিপির নেতারা বলছেন, অনেক আসনেই এখন কোনো সমন্বয় নেই। সহযোগিতার অভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান নরসিংদী-২, চট্টগ্রাম-৮, রাজবাড়ী-২ ও নেত্রকোনা-২ আসনে। এসব আসনে জোটের শরিকরা বিশেষ করে জামায়াত—প্রায় কোনো সহায়তাই দিচ্ছে না। হাতে গোনা কিছু আসনে সীমিত সহযোগিতা পেলেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে মিলছে অসহযোগিতার চিত্র।
এক্ষেত্রে সবচেয়ে সংকটাপন্ন হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে চট্টগ্রামের পরিস্থিতিকে। চট্টগ্রাম-৮ আসনে জামায়াত সহযোগিতা তো করছেই না; বরং বলা যায় বিদ্রোহী আচরণ করছে।
চট্টগ্রাম-৮ আসনে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে এনসিপি মনোনীত জুবায়েরুল হাসান আরিফ মাঠে প্রচার চালাচ্ছেন। তবে একই সঙ্গে ওই এলাকায় জামায়াতের এমডি আবু নাসেরের পোস্টার ও বিলবোর্ড ছড়িয়ে পড়েছে। জামায়াত কর্মীদের একাংশ সহযোগিতার বদলে বিদ্রোহীর মতো আচরণ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যা হতাশা সৃষ্টি করেছে এনসিপির মধ্যে।
নরসিংদী-২ আসনেও জোটের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এসেছে। এনসিপি জোটের প্রার্থী হিসেবে সরোয়ার তুষারকে মনোনয়ন দিলেও জামায়াতের প্রার্থী সরে দাঁড়াননি; ফলে ব্যালট পেপারে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক থেকেই গেছে।
যদিও জোট নেতারা কর্মীদের তুষারের পক্ষে প্রচারের নির্দেশ দিয়েছেন, জামায়াতের কিছু নেতা-কর্মী সেই নির্দেশ উপেক্ষা করেছেন।
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার অভিযোগ করেছেন, কিছু নেতা ও কর্মী গোপনে জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘ভোট মানুষ গোপনে দেয়, কিন্তু প্রচার প্রকাশ্য বিষয়। কোনো দায়িত্বশীল সংগঠন গোপনে প্রচার চালাতে পারে না।’
এনসিপির একটি সূত্র জানিয়েছে, রাজবাড়ী-২ আসনে জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কর্মী সহযোগিতা করছেন না, ফলে চাপের মুখে পড়েছেন এনসিপি প্রার্থী। নেত্রকোনা-২ আসনেও জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে একই ধরনের অসন্তোষের অভিযোগ উঠেছে।
এনসিপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন ব্যবস্থাপনা কমিটির মিডিয়া সেক্রেটারি ইয়াসির আরাফাত টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রচারের জন্য দলগত কাজ দরকার, আর সেখানেই দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।’
নির্বাচনী অর্থায়নও বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে। এনসিপি প্রার্থীদের অভিযোগ, জোটের শরিকদের কাছ থেকে তারা কোনো আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন না।
চট্টগ্রাম-৮ সহ আরও কয়েকটি আসনে দলীয় নেতাদের দাবি, জামায়াত সমর্থকদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ এনসিপি আসনে ব্যয় না করে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী পাশের আসনগুলোতে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় এনসিপি প্রার্থীরা প্রচার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
প্রত্যাশিত আর্থিক সহায়তা দিতে জোট ব্যর্থ হওয়ায় প্রচার কার্যক্রমে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন এনসিপি নেতারা। তাদের মতে, এটি শুধু কয়েকজন প্রার্থীর সমস্যা নয়; বরং জোটের সামগ্রিক আর্থিক চাপেরই প্রতিফলন।
সম্প্রতি অনলাইনে খবর ছড়ায়, জোটের প্রার্থীরা প্রত্যেকে জামায়াতের কাছ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা করে পাবেন। এনসিপি নেতারা বলছেন, এই গুজবে উল্টো তাদের ক্ষতি করেছে।
দলের যুগ্ম প্রধান সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহিন বলেন, ‘অনলাইনে গুজব ছড়ানো হয়েছিল যে প্রত্যেক প্রার্থী ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা পাবেন, কিন্তু বাস্তবে একটি টাকাও পাওয়া যায়নি। পুরো বিষয়টি বানানো।’
জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের নির্বাচনী সফর নিয়েও নতুন করে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এনসিপি নেতাদের অভিযোগ, তিনি যেসব এলাকায় সভা করেছেন, সেখানে ভোটারদের কাছে ভালো বার্তা পৌঁছানো গেছে, কিন্তু এনসিপির জন্য বরাদ্দ অধিকাংশ আসনই তিনি এড়িয়ে গেছেন।
এনসিপির দাবি, জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নেতারা যেখানে উপস্থিত থাকেন, সেসব অনুষ্ঠানে বাড়তি সহযোগিতা পাওয়া যায়; কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত বা গণমাধ্যমে কম আলোচিত প্রার্থীদের আসনগুলোয় তেমন সহায়তা মেলে না। তাদের অভিযোগ, জয়ের জন্য জামায়াত যেসব আসন সম্ভাবনাময় মনে করছে, সেগুলোতেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে অন্যগুলো।
এনসিপি নেতারা বলেন, তাদের দলের নাহিদ বা নাসিরউদ্দিন পাটোয়ারী জামায়াত প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার চালালেও উল্টোটা হয়নি। জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নেতারা এনসিপির বেশিরভাগ আসনেই যাননি।
এক্ষেতেও ঢাকার একটি ঘটনার উদাহরণ দেন তারা। ঢাকা ৬ আসনের এক সমাবেশে জামায়াতের আমির প্রকাশ্যে ঢাকা ৮ আসনে এনসিপির প্রার্থী নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারীকে স্বাগত জানান। পরে তিনি ঢাকা ২ আসনে গিয়ে জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে সমাবেশে বক্তব্য দেন। এ ছাড়া পঞ্চগড়-১ আসনে এনসিপির সারজিস আলমের পক্ষে তিনি ব্যাপক প্রচার চালান। এই আসনটি এনসিপির জন্য পুরোপুরি বরাদ্দ একমাত্র আসন। এনসিপি নেতাদের অভিযোগ, এর বাইরে অন্য আসনগুলো উপেক্ষিতই থেকে গেছে।
নতুন দলটির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কাগজে-কলমে সমন্বয় থাকলেও বাস্তবে জোটে নির্বাচনের জন্য তা প্রয়োজনীয় মাত্রায় নেই।
তিনি বলেন, ‘জামায়াতের নায়েবে আমির তাহেরের আসনে প্রচার চালিয়েছেন নাহিদ, হামিদুর রহমান আজাদের আসনেও প্রচার হয়েছে। কিন্তু আমাদের অধিকাংশ আসনে কেউ আসেনি।’
জামায়াত এনসিপির জন্য ৩০টি আসন ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিলেও নরসিংদী-২ ও চট্টগ্রাম-৮ আসনে তাদের প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত সরে দাঁড়াননি। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিলেও ওই দুই আসনে ব্যালটে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক থেকে গেছে।
এনসিপির জন্য বরাদ্দ ৩০টি আসনের মধ্যে ১২টিতে এক বা একাধিক জোট শরিকের বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে। মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থীরা যে ছয়টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, সেগুলোতে জামায়াত স্পষ্ট অবস্থান নিতে পারেনি, তাতে পিছিয়ে পড়েছে এনসিপি।
জামায়াতের বরাদ্দ দেওয়া এনসিপির কয়েকটি আসনের স্থানীয় সূত্র জানায়, এনসিপি প্রার্থীরা জনপ্রিয়তায় জামায়াতের নেতাদের তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে। অনেক প্রার্থী ও সমর্থক মনোনয়ন মেনে নিতে পারেননি; তাদের যুক্তি, জামায়াতের প্রার্থীরাই বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে আরও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারতেন, যা স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষোভ তৈরি করেছে।
তবে এনসিপির মিডিয়া উপকমিটির প্রধান মাহবুব আলম আশা প্রকাশ করে বলেন, অধিকাংশ আসন এখনও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘দুয়েকটি আসনে সমস্যা আছে, আশা করি, সেগুলো খুব দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে। আগে ছয়টি আসনে সমস্যা ছিল, তার অনেকটাই এখন কেটেছে। আলাপ-আলোচনা চলছে এবং পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো।’
তিনি যোগ করেন, ‘বর্তমানে সবচেয়ে সংকটে আছে চট্টগ্রাম-৮ ও নরসিংদী-২ আসন। বিষয়গুলো নির্বাচন কমিশনকে জানানো হয়েছে। আশা করি শিগগিরই সমাধান হবে।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং আসন থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘সব জায়গায় আমাদের পর্যাপ্ত জনবল নেই, এটি বড় চ্যালেঞ্জ। যেখানে কর্মী কম, সেখানে মূল কমিটি থেকে কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি গঠন করা হচ্ছে। জোটের শরিকদের কাজের পরিধি ভিন্ন হওয়ায় সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
জুবায়ের আরও বলেন, আগামী কয়েক দিনে সব স্তরের নেতাদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করা হবে এবং কোনো বাধা ছাড়া নির্বাচনী প্রস্তুতি সম্পন্ন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে জামায়াত।


