গত কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড গড়েছে চট্টগ্রাম। শনিবার দিবাগত রাত থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত চার দিনে নগরীতে মোট ১ হাজার ১৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে মঙ্গলবার দুপুর ৩টা থেকে বুধবার দুপুর ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যা ১৯৮৩ ও ২০০৭ সালের পূর্ববর্তী রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
এই বিপুল পরিমাণ বৃষ্টিপাতের পরও নগরীতে জলাবদ্ধতার পরিস্থিতি অতীতের তুলনায় অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে দাবি করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন। তার মতে, জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতির কারণেই বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিকালে চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত ১৯ সদস্যের কমিটির জরুরি সভা শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ দাবি করেন।
মেয়র বলেন, ২০০৭ সালে ৪০৮ মিলিমিটার বৃষ্টিতে ভয়াবহ পাহাড়ধস ও বন্যার সৃষ্টি হয়েছিল, যাতে ১২৭ জন প্রাণ হারান। অথচ এবার তার চেয়েও বেশি ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলেও পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তার দাবি, গত কয়েক বছরে বাস্তবায়িত জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের ফলে নগরীর প্রায় ৬০ শতাংশ জলাবদ্ধতা কমানো সম্ভব হয়েছে। এর ফলে একসময় দীর্ঘ সময় পানিতে নিমজ্জিত থাকা বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, চকবাজার ও দুই নম্বর গেটসহ বিভিন্ন এলাকায় এখন দ্রুত পানি নেমে যাচ্ছে।
শাহাদাত হোসেন বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ না হলে এত বিপুল বৃষ্টিপাতে চট্টগ্রাম কার্যত পানির নিচে তলিয়ে যেত। বিশ্বের অনেক শহরে সারা বছরে যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়, চট্টগ্রামে মাত্র চার-পাঁচ দিনেই তার সমপরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, সেনাবাহিনী, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), ওয়াসা, জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্টসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানরত মানুষদের জন্য সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নিয়মিত খাবার ও ত্রাণসামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হিসেবে অতীতের খাল দখল ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণকে দায়ী করেন মেয়র। তিনি বলেন, বামনশাহী খাল, কৃষ্ণখালসহ নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাল দখল করে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ক্লাব, আবাসিক স্থাপনা ও গরুর খামার পর্যন্ত গড়ে তোলা হয়েছে। পাশাপাশি অনেক স্থানে ড্রেনের ওপর কংক্রিটের ঢাকনা ও ফুটপাত নির্মাণ করা হলেও পানি প্রবেশের প্রয়োজনীয় ছিদ্র রাখা হয়নি। ফলে বৃষ্টির পানি ড্রেনে প্রবেশ করতে না পেরে সড়কে জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে মেয়র বলেন, পতেঙ্গার গুপ্তাখালসহ বিভিন্ন খাল উদ্ধার ও প্রশস্তকরণের কাজ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর পরিচালনা করছে। বর্তমানে বারেপাড়া খালের ৯৮ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি আরও ৪০টি খাল সংস্কারের জন্য নতুন প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে মেয়র বলেন, এটি একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ও সিটি করপোরেশন সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জলাবদ্ধতা কমাতে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। বিশেষ করে খাল ও ড্রেনে প্লাস্টিক, পলিথিন এবং অন্যান্য বর্জ্য না ফেলার আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন, চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শামছুল আলম, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া এবং ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেডের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ মহসিনুল হক চৌধুরী।


