পুলিশের তৈরি ঢাকার শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকায় থাকা তারিক সাইফ মামুনের (৫২) হত্যার ঘটনা দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ড জগতে নতুন ঢেউ তুলেছে।
গোয়েন্দারা বলছেন, এই হত্যার পেছনে মামুনের একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী কিন্তু পরবর্তীকালে প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠা সানজিদুল ইসলাম ইমনের পাশাপাশি এখন আরেক কুখ্যাত সন্ত্রাসী তোফায়েল আহমেদ জোসেফের নামও সামনে এসেছে।
পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জোসেফ তার ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। যে হত্যার সঙ্গে মামুন জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তারা মনে করছেন, ইমন ও জোসেফ মিলে নিজেদের একক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করতেই এই গুপ্তহত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন।
ভিডিও ফুটেজ দেখে শনাক্ত করার পর পুলিশ মঙ্গলবার মামুন হত্যায় জড়িত সন্দেহে পাঁচজনকে আটক করেছে।
যাদের মধ্যে রুবেল ও ইব্রাহিম নামে দুজন পেশাদার শ্যুটার রয়েছেন, যারা চুক্তির ভিত্তিতে কাজ করেন।
জিরো টলারেন্সের প্রতিশ্রুতি পুলিশের
পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’
সে অনুযায়ী কাজ করতে পুলিশের সব ইউনিটকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তদন্ত কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে মামুন হত্যাকাণ্ডে দুটি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। অবশ্য মঙ্গলবার সে দুটিও উদ্ধার করা হয়েছে।
ঢাকায় সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোয় অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধির বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন তারা।
বেশ কয়েকটি গোপন গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুসারে, শিথিল হয়ে পড়া পুলিশি নজরদারি এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতার ফলে শহরের আন্ডারওয়ার্ল্ডে অস্ত্রের ভাণ্ডার বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রকাশ্য দিবালোকে মামুন হত্যার মতো হাই-প্রোফাইল হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখাসহ (ডিবি) সব ইউনিট সশস্ত্র গ্যাংগুলোকে খুঁজে বের করতে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে।
নেটওয়ার্কের সন্ধানে গোয়েন্দারা
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আসল অপরাধীদের’ খুঁজে বের করতে ডিবির একাধিক দল এখন কাজ করছে।
পুরানো ফাইল ধরে হাঁটলে নতুন অপরাধীরা সুযোগ পাবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সক্রিয় অপরাধীরা ধরা পড়লে তাদের নেপথ্যে কারা তা জানা যাবে, গডফাদাররা চিহ্নিত হবে।’
ক্ষমতা পরিবর্তনের পর আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুনরুত্থান
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার তথ্য মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শীর্ষ সন্ত্রাসী আব্বাস আলী ওরফে কিলার আব্বাস, সুইডেন আসলাম, ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন, খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন, খোরশেদ আলম ওরফে ফ্রিডম রাসু কারামুক্ত হন।
এসব সন্ত্রাসীরা আগে অধিকাংশ মামলায় জামিন পেলেও ‘ক্রসফায়ার’ আতংকে কারাগারে থাকার পথ বেছে নিয়েছিলেন।
তাদের মুক্তির পর, আরও দুই কুখ্যাত গ্যাং লিডার সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ ভারত থেকে ফিরে আসেন। কিন্তু পরে কুষ্টিয়ায় একটি সামরিক অভিযানে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তারা এখনো কারাগারে।
এরই মধ্যে, জিসান আহমেদ মন্টি ও শাহাদাত নামে এই দুই গ্যাং লিডার বিদেশ থেকে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। পুলিশের ধারণা, এরা দুজনেই আধুনিক অস্ত্রের বিশাল ভাণ্ডার নিয়ন্ত্রণ করেন।
সম্প্রতি আমিন রসুল সাগর ওরফে টোকাই সাগর যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে এসে ঘুরে গেছেন। ফ্রান্সে বসে তৎপর বিকাশ কুমার বিশ্বাস। যিনি ২০১২ সালের ১৪ ডিসেম্বর কারামুক্তির পর বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে যান। পরে প্যারিসে পাড়ি জমিয়েছেন।
জোসেফ সংযোগ
২০১৮ সালের ২৭ মে হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত নব্বইয়ের দশকের শীর্ষ সন্ত্রাসী তোফায়েল আহমেদ জোসেফ রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় মুক্তি পেয়েছিলেন। কারামুক্তির পর দেশে বেশকিছুদিন তৎপর থেকে দেশ ছাড়েন। জোসেফ সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই। তার আরেক ভাই হারিছ আহমেদও বিদেশে থেকে অপরাধজগতের কলকাঠি নাড়ছেন।
প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিশোধ
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, সোমবার সকালে আদালতে যাওয়ার পথে জনসন রোডের কাছে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত মামুন একসময় ইমনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিল।
২৪ বছর কারাভোগের পর মামুন ২০২৩ সালে মুক্তি পায়, আর ইমন গত বছর ৫ আগস্টের ক্ষমতা পরিবর্তনের পর ছাড়া পায়।
মুক্তির পর মামুন হাজারীবাগ, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও তেজগাঁও এলাকার নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে। যা ইমনকে ক্ষুব্ধ করে তোলে এবং সে মামুনের হত্যার ষড়যন্ত্র করে।
এদিকে, জোসেফ ও হারিস ২৬ বছর ৮ মাস আগে ১৯৯৯ সালের ১৩ মার্চ টিপু হত্যার প্রতিশোধ নিতে মামুনকে আগেই তাদের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। তাদের টার্গেট লিস্টে ইমনও রয়েছে। তকে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার ফর্মুলায় ইমনকে ‘ম্যানেজ’ করে পরিকল্পনা সাজিয়ে ভাড়াটে খুনি দিয়ে মামুনকে হত্যা করে জোসেফ ও হারিছ।
ইমন ও মামুন দুজনেই চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী এবং সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যা মামলার আসামি।
এলাকার দখল ও সশস্ত্র প্রস্তুতি
সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া বেশ কয়েকজন অপরাধীর মতে, এলাকার দখল, চাঁদাবাজি এবং রাজনৈতিক সুরক্ষার বিরোধকে কেন্দ্র করে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড আবারও মেরুকরণের দিকে যাচ্ছে।
তারা জানান, বিভিন্ন গোষ্ঠী রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে কিশোর-তরুণদের দলে ভেড়াচ্ছে।
শহরের চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিশেষ করে মিরপুর, পল্লবী, কাফরুল, গুলশান, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, ফার্মগেট, মতিঝিল, মগবাজার এবং পুরান ঢাকায় তীব্র হয়ে উঠেছে। একসময়ের প্রভাবশালী ‘সেভেন স্টার’ ও ‘ফাইভ স্টার’ গ্যাংয়ের জায়গা নিয়েছে নতুন গঠিত ‘ফোর স্টার’ গ্রুপ। যার নেতৃত্বে রয়েছে মিরপুরের মামুন, ইব্রাহিম, শাহাদাত ও মুক্তার।
বলা হয়, এই গ্যাংটি ঢাকার চাঁদাবাজির নেটওয়ার্কের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে।
মামুনের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি
মামুনের ভাই ইশতিয়াক মোহাম্মদ ইকবাল জানিয়েছেন, গ্রামের বাড়িতে তার ভাইকে দাফন করা হয়েছে। এখন ঢাকায় ফিরে তারা মামলা করবেন।


