৩ মিনিটের বেশি টয়লেটে থাকলেই মারধর: গুমের বর্ণনায় ডা. আশিক

৩ মিনিটের বেশি টয়লেটে থাকলেই মারধর: গুমের বর্ণনায় ডা. আশিক
ছবি: বাসস
Advertisement
Advertisement

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম ও নির্যাতনের এক লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন চিকিৎসক আশিক উল আকবর।

তার ভাষ্য, ২০১৬ সালে গুম হওয়ার পর প্রায় ৬০ দিন তাকে ২৪ ঘণ্টা চোখ বাঁধা এবং দুই হাত পেছনে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে রাখা হয়েছিল। টয়লেট ও গোসলের জন্য দিনে মাত্র দুবার সুযোগ দেওয়া হতো এবং সর্বোচ্চ তিন মিনিটের মধ্যে প্রস্রাব, পায়খানা ও গোসল শেষ করতে হতো।

বৃহস্পতিবার মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় প্রসিকিউশনের ষষ্ঠ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন ৩১ বছর বয়সী এই চিকিৎসক।

আশিকের বাড়ি রংপুরে। ২০১৬ সালে তিনি রংপুর প্রাইম মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তার জবানবন্দি অনুযায়ী, তিনি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ‘সাথী’ ছিলেন এবং শেখ হাসিনা ও তার সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিতেন। ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের ডাকে ঢাকায় শাপলা চত্বরের সমাবেশেও গিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, শাপলা চত্বরের ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেখ হাসিনা ও তার সরকার এবং ভারতবিরোধী বিভিন্ন পোস্ট করতেন। এসব পোস্টে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার ও ফলো করতেন।

আশিকের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৩ মে গাজীপুরের টঙ্গীতে মামার বাড়িতে অবস্থানকালে রাত সাড়ে ৩টার দিকে ১০ থেকে ১২ জন সাদা পোশাকের ব্যক্তি দরজায় নক করেন। দরজা খোলার পর নাম বলার সঙ্গে সঙ্গে তার মাথায় কালো কাপড় পরিয়ে মারধর করতে করতে বাসা থেকে বের করে একটি মাইক্রোবাসে তোলা হয়।

গাড়িতে তার চোখ শক্ত করে বেঁধে ‘জমটুপি’ পরানো হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর অজ্ঞাত একটি স্থানে পৌঁছালে তিনি বিমান ওঠানামার শব্দ শুনতে পান বলে জানান। পরে কয়েক ধাপ সিঁড়ি দিয়ে তাকে একটি স্থাপনার ভেতরে নেওয়া হয়।

৬০ দিন চোখ বাঁধা অবস্থায়

তার দাবি, ওই স্থানে তাকে প্রায় ৬০ দিন ২৪ ঘণ্টা চোখ বেঁধে এবং দুই হাত পেছনে নিয়ে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে রাখা হয়। খাবারের সময় এক হাতের হ্যান্ডকাফ খুলে চোখের বাঁধন কিছুটা ওপরে তুলে দেওয়া হতো। খাবার খেতে অনীহা প্রকাশ করলে মারধর করা হতো।
গোসল ও টয়লেট ব্যবহারের জন্য তাকে কয়েক ধাপ সিঁড়ি নামিয়ে একটি কক্ষে নেওয়া হতো। সেখানে এক হাতের হ্যান্ডকাফ খুলে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হতো। চোখের বাঁধন খোলার পর সর্বোচ্চ তিন মিনিটের মধ্যে প্রস্রাব, পায়খানা ও গোসল শেষ করতে হতো। এর বেশি সময় লাগলে মারধর করা হতো বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি।

দিনে মাত্র দুবার টয়লেটে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হতো। এর বেশি প্রয়োজন হলে হ্যান্ডকাফ দিয়ে আঘাত করে শব্দ করতে হতো। এ ছাড়া ওই স্থানে থাকার সময় তিনি ট্রেন চলাচলের শব্দও শুনতে পেতেন বলে আদালতকে জানান।

ঝুলিয়ে নির্যাতন, দেওয়া হয় বৈদ্যুতিক শক

জবানবন্দিতে আশিক অভিযোগ করেন, একপর্যায়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষে নিয়ে একটি জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করতে বলা হয়। অস্বীকার করলে শুরু হয় নির্যাতন।

তার হাতের হ্যান্ডকাফ খুলে একটি গামছার সঙ্গে হুক লাগিয়ে মেশিনের সাহায্যে তাকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় বলে জানান তিনি। দীর্ঘ সময় ঝুলিয়ে রাখার কারণে দুই হাতের বগলের নিচের চামড়া ছিঁড়ে যেতে থাকে। একপর্যায়ে পাশে থাকা একজন তাকে বেশি ওজনের উল্লেখ করে মারা যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন বলেও আদালতকে জানান তিনি।

পরে দুই কানের লতিতে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন আশিক। এ পর্যায়ে জবানবন্দি দিতে গিয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। শেষ পর্যন্ত নির্যাতনের মুখে যা বলতে বলা হবে, তা স্বীকার করবেন বলে জানান তিনি।

আরও পড়ুন

সাদা কাগজে স্বীকারোক্তি লেখানোর অভিযোগ

আশিকের দাবি, পরে তাকে একটি প্রিন্টেড কাগজ ও একটি সাদা কাগজ দেওয়া হয়। প্রিন্টেড কাগজে থাকা লেখা হুবহু সাদা কাগজে লিখতে বলা হয়। এক হাতের হ্যান্ডকাফ খুলে দিয়ে এবং চোখের বাঁধন কিছুটা ওপরে তুলে তাকে লেখা শেষ করতে বাধ্য করা হয় বলে জানান তিনি।

এ সময় তার ফেসবুক আইডি ও পাসওয়ার্ড নিয়ে নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পরে তার রেটিনা ও ১০ আঙুলের ছাপ নেওয়া এবং লিখিত জবানবন্দির ভিডিও ধারণ করা হয় বলে আদালতকে জানান।

দীর্ঘ সময় চোখ বাঁধা থাকার কারণে একপর্যায়ে তার ডান চোখের রেটিনা ছিঁড়ে যায় বলেও অভিযোগ করেন আশিক। তার দাবি, পরবর্তী সময়ে জামিনে মুক্ত হয়ে ওই চোখে অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছিল।

র‍্যাব-১-এর মিডিয়া সেন্টারে অস্ত্রের পাশে ছবি

আশিকের অভিযোগ, এরপর তাকে আরও তিনজনের সঙ্গে র‍্যাব-১-এর মিডিয়া সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখানে একটি ব্যাগ থেকে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, নাট-বল্টু ও বই বের করে একটি টেবিলে সাজানো হয়। তাদের টেবিলের পেছনে দাঁড় করিয়ে ছবি তোলা হয়।

পরে কারাগারে থাকা অবস্থায় বিভিন্ন সংবাদপত্রে ওই ছবি দেখতে পান বলে জানান তিনি।

এরপর তাদের টঙ্গী থানায় নেওয়া হয়। সেখানে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয় এবং আদালতে হাজির করে রিমান্ড চাওয়া হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি।

৬০ দিন পর দেখেন দিনের আলো

প্রায় ৬০ দিন পর তাকে বাসায় রেখে আসার কথা জানানো হয়। পুরোনো কাপড় পরিয়ে আবার চোখ বাঁধা হয়। পরে চোখের বাঁধন খুলে তাকে চোখ বন্ধ রাখতে বলা হয়। তার চুল কেটে ও দাড়ি কামিয়ে দেওয়ার পর আবার চোখে বাঁধন ও হাতে হ্যান্ডকাফ পরানো হয়।

এরপর তাকে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরানো হয়, যাতে ‘র‍্যাব’ লেখা ছিল বলে জানান তিনি। পরে জমটুপি ও হেলমেট পরিয়ে একটি মাইক্রোবাসে তোলা হয়।

প্রায় দেড় ঘণ্টা পর গাড়িটি অজ্ঞাত একটি স্থানে থামে। সেখানে তাকে নামিয়ে চোখের বাঁধন ও হ্যান্ডকাফ খুলে দেওয়া হলে আনুমানিক ৬০ দিন পর প্রথমবারের মতো দিনের আলো দেখতে পান বলে আদালতকে জানান আশিক।

মামলা প্রত্যাহার ও শিক্ষাজীবনে ক্ষতি

আশিক জানান, কারাগারে যাওয়ার পর জানতে পারেন, তিনি নিখোঁজ থাকার সময় তার বাবা র‍্যাবের বিরুদ্ধে একটি অপহরণ মামলা করেছিলেন। তার অভিযোগ, ওই মামলা প্রত্যাহার করানোর জন্য তাকে একাধিক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়া হয়।

মামলা প্রত্যাহার না করলে একের পর এক মামলায় রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও আদালতকে জানান তিনি।

তার ভাষ্য, প্রায় দুই মাস গুম এবং ১৩ মাস কারাগারে থাকার পর হাইকোর্টের আদেশে তিনি জামিনে মুক্ত হন। গুমের কারণে তার মেডিকেল পড়াশোনা তিন বছর পিছিয়ে যায় এবং ২০২৩ সালে তিনি এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন বলে জানান।

জবানবন্দির শেষ দিকে আশিক তার ওপর নির্যাতনের জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারেক সিদ্দিকী, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট র‍্যাব সদস্যদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।

জবানবন্দি শেষে আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. শাহীনুর ইসলাম সাক্ষীকে জেরা করেন।

টিএফআই সেলে গুমের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় শেখ হাসিনা এবং বর্তমান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে করা মামলায় আদালত পাঁচটি অভিযোগ গঠন করেছে।

মামলায় ১৭ আসামির মধ্যে ১০ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। তারা সবাই সেনা কর্মকর্তা। গ্রেপ্তার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান, কর্নেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, কর্নেল কে এম আজাদ, কর্নেল মো. কামরুল হাসান, কর্নেল মো. মাহাবুব আলম, কর্নেল মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আল মোমেন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সারোয়ার বিন কাশেম, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মশিউর রহমান জুয়েল এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন।

পলাতক সাত আসামি হলেন শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকী, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি এম খুরশিদ হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মো. হারুন অর-রশিদ এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. খায়রুল ইসলাম।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad