আপনার হাতে যদি একটি টাইম মেশিন থাকত, তাহলে আপনি ভবিষ্যতে যেতেন, নাকি ফিরতেন অতীতে?
সত্যিই প্রশ্নটি লাখ টাকার। তবে আমাকে জিজ্ঞেস করলে নির্দ্বিধায় বলব, আমি অতীতেই ফিরতে চাই।
আমার মতো এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা ফেলে আসা দিনগুলোর স্বাদ আবারও পেতে চান।
টাইম মেশিন এখনো কেবল কল্পকাহিনির পাতায় সীমাবদ্ধ। তবে অতীতের কোনো সময়কে ফিরে দেখার বা সেই সময়ের আবহ অনুভব করার সুযোগ যে একেবারেই নেই, তা নয়।
ধানমন্ডির ব্যস্ত কোলাহলের মাঝেই এমন একটি জায়গা আছে, যেখানে বস্তুবাদ আর প্রতিদিনের একঘেয়েমি পেছনে পড়ে থাকে। তার বদলে জায়গা করে নেয় স্মৃতিকাতরতা আর হারিয়ে যাওয়া সময়ের এক অনন্য আবেশ।
জায়গাটির নাম ‘ভিনাইল ম্যাডনেস’।

এই ব্যতিক্রমী সময়ের কুঠুরি যিনি কল্পনা করেছেন এবং বাস্তবে রূপ দিয়েছেন, তার নাম সাদি মনজুরুল হক। পুরোনো ঢাকার স্মৃতিমাখা দিনগুলোর খোঁজে যারা কিছুটা সময় কাটাতে চান, তাদের কাছে তিনি ‘ভিনটেজ উইজার্ড’ বা পুরোনো দিনের জাদুকর নামে পরিচিত।
দীর্ঘ সময়ের সংগীত উপভোগের মাধ্যম ভিনাইল রেকর্ডের প্রতি নিজের ভালোবাসার জন্য সাদি পুরো কৃতিত্ব দেন তার শিল্পমনস্ক মা-বাবাকে। কৈশোরের স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, ‘মা-বাবার কাছ থেকে আমি অনেক ভিনাইল রেকর্ড পেয়েছিলাম। একদিন চাচার পরামর্শে টার্নটেবলে রেকর্ড বাজিয়ে শোনার সিদ্ধান্ত নিই। উদ্দেশ্য ছিল, সংগীত শোনার অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করা।’
শুরুতে একটি টার্নটেবিল, স্পিকার ও অ্যামপ্লিফায়ার কিনতে বেশ ভালো অঙ্কের টাকা খরচ করেছিলেন সাদি। কিন্তু সেগুলোতে গান শুনে তিনি খুব একটা সন্তুষ্ট হতে পারেননি।
সাদির ভাষায়, শব্দ ছিল তীক্ষ্ণ, সুরেলা নয়। আওয়াজ ছিল জোরালো, কিন্তু গভীরতা ছিল না।
তিনি বলেন, ‘সেগুলো বিক্রি করে আমি ১৯৭৭ সালের একটি অ্যামপ্লিফায়ার, ১৯৯০ সালের একটি টার্নটেবিল এবং ১৯৮২ সালের এক জোড়া স্পিকার কিনলাম।’
এরপরের অভিজ্ঞতা ছিল এককথায় জাদুকরি। সাদি বলেন, ‘সেই যন্ত্রগুলো থেকে যে সংগীত বেরিয়ে এল, তা ছিল ভীষণ প্রশান্তিদায়ক। গান শুনতে শুনতে এর শব্দের সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্যগুলোও উপভোগ করা যাচ্ছিল।’
এই তিনটি পুরোনো যন্ত্রের সম্মিলিত জাদুকরি শব্দই সাদিকে অন্য সংগীতপ্রেমীদের আমন্ত্রণ জানানোর অনুপ্রেরণা জোগায়। তিনি চাইলেন, মানুষ আসুক, বসুক, কিছুটা সময় বিশ্রাম নিক আর উপভোগ করুক ভিনাইল রেকর্ডে গান শোনার অভিজ্ঞতা।
সাদি বলেন, ‘প্রতিদিন অনেক মানুষ আসতে শুরু করলেন। আমার সংগীতের প্রতি ভালোবাসা এবং সংগীতপ্রেমীদের উপস্থিতি দেখে আমার স্ত্রী একদিন আলাদা একটি জায়গা তৈরি করার পরামর্শ দিলেন। সেখানেই একটি সংগীতের পরিসর গড়ে তোলার ভাবনা থেকে ভিনাইল ম্যাডনেসের জন্ম।’

নিজের আবাসিক ভবনের একটি সাধারণ জায়গা সাজিয়েই ভিনাইল স্টুডিওর যাত্রা শুরু করেন সাদি। আজ সেটি একদিকে নবীন সংগীতশিল্পীদের একসঙ্গে গান চর্চা ও পরিবেশনার জায়গা, অন্যদিকে একধরনের জাদুঘর। এখানে সাজানো নানা ধরনের পুরোনো সামগ্রী যেন দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরে সত্তর ও আশির দশকের ঢাকার এক টুকরো ছবি।
ভিনাইল রেকর্ডপ্রেমীদের জন্য এখানে রয়েছে মন ভরিয়ে দেওয়ার মতো সংগ্রহ। আবার পুরোনো ক্যামেরা সংগ্রহের নেশা থাকলে সেটিরও অভাব নেই। বিশেষ করে বেলোস ক্যামেরার রয়েছে চমৎকার একটি সংগ্রহ।
সাদি বলেন, ‘ক্যামেরার প্রতি আমার সব সময়ই আলাদা দুর্বলতা ছিল। মানুষের কাছ থেকে এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আমি পুরোনো ক্যামেরা সংগ্রহ করি।’
ক্যামেরার সংগ্রহটি সত্যিই আকর্ষণীয়। এতে রয়েছে ষাটের দশকের বেলোস ক্যামেরা, সত্তরের দশকের ইনস্টাম্যাটিক ক্যামেরা এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ফিল্ড ক্যামেরা।
ভিনাইল ম্যাডনেস মূলত তিনটি উদ্দেশ্য নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। প্রথমত, যাঁরা নিজেদের পছন্দের রেকর্ড শুনতে চান, তাঁরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জায়গাটি বুক করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, সংগীত চর্চা করতে আগ্রহীরা এখানকার বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করে অনুশীলন করতে পারেন। তৃতীয়ত, সংগ্রাহকেরা এখানে সাজানো নানা ধরনের পুরোনো সামগ্রী ঘুরে দেখতে পারেন এবং পছন্দ হলে কিনেও নিতে পারেন।
বিক্রির জন্য রাখা ভিনাইল রেকর্ডগুলোর দাম ৫০০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বলে জানান সাদি।
আর সংগীত শোনার বিশেষ আয়োজনের জন্য জনপ্রতি খরচ ১ হাজার টাকা। এ ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন পাঁচজন এবং সর্বোচ্চ ১৫ জন অংশ নিতে পারেন।
সাদি বলেন, ‘এ ধরনের আয়োজনের জন্য আমরা বিশেষ পরিবেশ তৈরি করি। আলো কমিয়ে দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট সময়টুকুতে অন্য কোনো সংগীত চর্চা বা জ্যামিং বন্ধ রাখা হয়। ফলে শ্রোতারা পুরোপুরি সংগীতের মধ্যে ডুবে থাকার সুযোগ পান।’
জায়গাটি পুরোপুরি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত। তাই এখানে ধূমপানের অনুমতি নেই।

সাদির মতে, ভিনাইল রেকর্ডে গান শোনার সময় অন্য কোনো ধরনের নেশাদ্রব্যের প্রয়োজন হয় না। এখানকার পরিবেশ আর সংগীতই এমন এক ঘোর তৈরি করে, যা শ্রোতাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। কথাটি বলার সময় তার মুখে ছিল মৃদু হাসি।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ম্যানুয়াল টাইপরাইটারে লেখালেখি শুরু করা একজন সাংবাদিক হিসেবে ঘরের এক পাশে পাশাপাশি সাজিয়ে রাখা তিনটি টাইপরাইটার আমার চোখ এড়ায়নি।
সাদি জানালেন, সেগুলোও বিক্রির জন্য রাখা হয়েছে। তবে দাম কত, তা আর জিজ্ঞেস করা হয়নি।
রেকর্ডের স্তূপ ঘাঁটতে ঘাঁটতে একসময় সাদি বের করে আনলেন ব্রিটিশ হেভি মেটাল ব্যান্ড আয়রন মেইডেনের প্রথম অ্যালবামটি।
লেখকের কাছে অ্যালবামটি ছিল আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ের আরেকটি স্মৃতির দরজা। মনে পড়ে গেল আয়রন মেইডেনের শুরুর দিকের জনপ্রিয় গান ‘প্রলার’, ‘রানিং ফ্রি’ এবং ‘ফ্যান্টম অব দ্য অপেরা’র কথা।
ভিনাইল ম্যাডনেসের পুরো পরিবেশে একধরনের নেশা ধরানো আবেশ রয়েছে। সেখানে সাদি মনজুরুল হককে দেখে মনে হয়, তিনি যেন আধুনিক শহরের এক ভবঘুরে সাধক। আর বোঝাই যায়, নিজের তৈরি এই নিরিবিলি জগতে তিনি দারুণ আনন্দে সময় কাটান।
তবে তার আরেকটি পরিচয় শুনলে কিছুটা অবাক হতে হয়। সূর্য ডোবার পর যিনি এক স্বচ্ছন্দ বোহেমিয়ান জীবনযাপনে মেতে ওঠেন, দিনের বেলায় তিনিই একজন নিবেদিতপ্রাণ পূর্ণকালীন ব্যাংকার।
অবশ্য এতে আপত্তির কিছু নেই। কারণ, তিনি একই জীবনে দুই ধরনের স্বাদ পাচ্ছেন—একদিকে গতানুগতিক দৈনন্দিন জীবন, অন্যদিকে সংগীত আর স্মৃতির এক রহস্যময় জগৎ।
ভিনাইল ম্যাডনেসে পৌঁছাতে হলে একটু খোঁজখবর করতে হবে। ইন্টারনেটে খুঁজে বের করতে হবে ঠিকানা। তবে সেখানে যাওয়ার এই খোঁজাখুঁজির মধ্যেও রয়েছে আলাদা এক রোমাঞ্চ।


