পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে প্রকাশ্যে হত্যার এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো বিচার পায়নি নিহতের পরিবার। এমনকি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো আসামিরা তার পরিবারকে প্রতিনিয়ত হত্যার হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা জানিয়েছেন সোহাগের পরিবার।
বৃহস্পতিবার সোহাগ হত্যার এক বছর পূর্ণ হয়। এদিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানী ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (মিটফোর্ড হাসপাতাল) তিন নাম্বার গেটে সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন সোহাগের পরিবারের সদস্যরা।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন- মামলার বাদী ও সোহাগের বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম, ভাগ্নি বিথি আক্তার, সোহাগের ছেলে সোহান, মেয়ে সোহানা এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা।
বিথি আক্তার বলেন, ‘আজ হত্যাকাণ্ডের এক বছর পূর্ণ হলেও আমরা এখনো এর সুষ্ঠু বিচার পাইনি। মামলার সব আসামি এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। কেউ কেউ প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। নতুন করে অপরাধেও জড়াচ্ছেন। অভিযোগপত্রভুক্ত ২ নম্বর আসামি সারোয়ার হোসেন টিটু আমাদের প্রতিনিয়ত হুমকি দিয়ে আসছেন। তিনি সারাক্ষণ অনলাইনে থাকেন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপ ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে আমাদের হুমকি দেন।’
এজাহারভুক্ত ২১ আসামির মধ্যে ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও এখনো আটজন পলাতক রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মামলার ১৯ নম্বর আসামি শারাফাত ওরফে শফিউল ইসলাম প্রকাশ্যে চলাফেলা করছেন। তিনিও আমাদের হুমকি দিচ্ছেন। তিনি নিজেই জামিনে বের হওয়ার কথা জানিয়েছেন কিন্তু তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এমন কোন তথ্যও আমাদের কাছে ছিল না।’ শাফায়াত এখনো চাঁদাবাজি করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের পর জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তারসহ মামলার বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এক বছরেও বিচার হয়নি।
বিথি ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত যে বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়নি সেটা কি আমরা পুলিশের ব্যর্থতা বলে গণ্য করব নাকি তাদের অবহেলা। নাকি তারা কোন কিছুর বিনিময় বিক্রি হয়ে গিয়েছে। তাদের অবহেলার কারণে আজ আমরা বিভিন্ন ধরনের হুমকির সম্মুখীন হচ্ছি।’
‘আমাদের কাছে তথ্য আছে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা ইমরান নামের একজনের নাম আছে কিন্তু তার বাবার নাম ও বয়স পরিবর্তন করে তাকে মামলা থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে। তিনি খালাস পাওয়ার পর আমাদের ভয়-ভীতি দেখাচ্ছেন। তিনি আমাদের হুমকি দিয়ে বলছেন, “সোহাগকে যেভাবে খাইছি তোদেরও একই ভাবে খাব”।’
মানববন্ধনে মামলার বাদী ও সোহাগের বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, ‘আমার ভাইকে হত্যার এক বছর হয়ে গেলেও এখনো সব আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। পলাতক আসামিরা প্রতিনিয়ত আমাদের হুমকি দিয়ে আসছে।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, ‘আমি চাই এই সরকার যেন আমার ভাইয়ের হত্যার সুষ্ঠু এবং দ্রুত বিচার করবে।’
নিহত সোহাগের মেয়ে সোহানা জানান, তার বাবাকে এক বছর আগে নৃশংসভাবেহত্যা করা হলেও এখনো তারা বিচার পাননি। মামলার পলাতক আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘আমাদের প্রতিনিয়ত হুমকি দিয়ে আসামিরা বলছে- তারা হয়তো আমাকে না হয় আমার ভাইকে কিডন্যাপ করবে।’
গত বছরের ৯ জুলাই পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (মিটফোর্ড হাসপাতাল) সামনের ব্যস্ত সড়কে লাল চাঁদকে হত্যা করা হয়েছিল। হাসপাতালের কাছের রজনী বোস লেনে ভাঙারির ব্যবসা করতেন তিনি।
পিটিয়ে, ইট-পাথরের খণ্ড দিয়ে আঘাত করে লাল চাঁদের মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ থেঁতলে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তাকে বিবস্ত্র করা হয়। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে তার শরীরের ওপর উঠে হত্যাকারীদের লাফাতে দেখা যায়।
নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের পরদিন গত বছরের ১০ জুলাই নিহত সোহাগের বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম রাজধানীর কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। মামলায় ১৯ জনকে আসামি করা হয়।
প্রায় ছয় মাস তদন্ত শেষে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন কোতোয়ালি থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান। অভিযোগপত্র পর্যালোচনা করে তাতে বানান ভুলসহ কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি সংশোধনের নির্দেশ দেন আদালত। এরই মধ্যে তদন্ত কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান শাহবাগ থানায় বদলি হয়ে যান।
এরপর মামলাটির দায়িত্ব পান কোতোয়ালি থানার নতুন ওসি শাহ মো. ফয়সাল আহমেদ। আদালতের নির্দেশের পাঁচ মাস পর ত্রুটিবিচ্যুতি সংশোধন করে গত জুন মাসে আবার অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ।
হত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ–পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগে মোট ২১ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছেন মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা শাহ মো. ফয়সাল আহমেদ। আর ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা না থাকায় ১০ আসামিকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে অভিযোগপত্রে।
অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিরা হলেন- মাহমুদ হাসান মহিন, সারোয়ার হোসেন টিটু, মঙ্গল মিয়া ওরফে মনির হোসেন, আলমগীর, মনির ওরফে লম্বা মনির, নান্নু ওরফে নান্নু কাজী, সজীব ওরফে সজীব ব্যাপারী, তারেক রহমান, টিটন গাজী, অপু দাস, রিজওয়ান উদ্দিন ওরফে অভিজিৎ বসু ওরফে অভি, জহিরুল ইসলাম, পারভেজ, সাগর, রুমান ব্যাপারী, আবির হোসেন, জহির ওরফে জলিল, ইমরান, শারাফাত ওরফে শফিউল ইসলাম, হোসেন চৌকিদার ও জিয়াউদ্দিন রাজীব।
অভিযোগপত্রভুক্ত ২১ আসামির মধ্যে ১৩ জন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। আটজন পলাতক। পলাতক আসামিরা হলেন- সারোয়ার, জহির, ইমরান, শারাফাত, জিয়াউদ্দিন, হোসেন চৌকিদার, মনির ও অপু।
ভাঙারির ব্যবসা নিয়ন্ত্রণসহ এলাকার আধিপত্য বিস্তার নিয়ে আসামি মাহমুদ হাসান ও সরোয়ার হোসেনের সঙ্গে বিরোধের কারণেই সোহাগকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছে পুলিশ।


