বিএনপি দেশে সরকার গঠনের পর ফের রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার আশা করেছিল ক্ষমতাচ্যুত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তবে যত সময় গড়াচ্ছে, সেই আশা ততো দ্রুত ফিকে হয়ে যাচ্ছে। আইনি বাধা, গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক চাপের কারণে দলটি নিজেদের সংগঠিত করতেই হিমশিম খাচ্ছে।
আওয়ামী লীগের কর্মীরা শুরুতে মনে করেছিলেন, জনগণের ভোটে নতুন সরকার গঠন হলে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে। সেই সঙ্গে আবারও মূলধারার রাজনীতিতে ফেরার পথ খুলবে। কিন্তু এখন সেই আশা অনেকটাই হতাশায় পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষক ও দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতার মতে, নতুন সরকারের কঠোর অবস্থান, দল হিসেবে বিএনপির কৌশল এবং ইসলামপন্থী ও নতুন রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধিতা-এই তিন গোলকধাঁধায় আওয়ামী লীগের ফেরার পথ অনেকটাই বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
একই সময়ে দলের ভেতরেও নেতৃত্ব নিয়ে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন তারা। দলের তৃণমূল ও সাধারণ মানুষের একটি অংশ বর্তমান নেতৃত্বকে মেনে নিতে চাইছে না। বিশেষ করে গুম, হত্যাকাণ্ড ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত নেতাদের নিয়ে তাদের মধ্যে তুমুল অসন্তোষ রয়েছে।
দলের ভেতরেই এখন অনেকে বলছেন, ‘স্বচ্ছ ভাবমূর্তির’ নতুন নেতৃত্ব না এলে জনগণের আস্থা ফিরে পাওয়া কঠিন হবে।
মাঠপর্যায়ের বর্তমান পরিস্থিতিও দলের জন্য অনুকূল নয়। সরকার পরিবর্তনের পর কিছু জেলা ও উপজেলায় আওয়ামী লীগের নেতা ও সমর্থকরা নতুন করে কার্যালয় খুললেও পরে আবার চাপের মুখে অনেক জায়গায় তা বন্ধ হয়ে যায়।
সে সময় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কার্যক্রম চালানোর অভিযোগে বেশ কয়েকজন কর্মীও গ্রেপ্তার হন।
শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক কিছু আইনি ঘটনাও দলটির রাজনীতিতে না ফেরার শঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। গত ৭ মার্চ শাহবাগে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচারের ঘটনায় সাবেক ছাত্রলীগ নেতাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ১২ মার্চ আওয়ামী লীগের পক্ষে মিছিল করার চেষ্টার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপককে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আটক করা হয়।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর গত দেড় বছরে অসংখ্য নেতা গ্রেপ্তারের পর জামিনে মুক্তি পেলেও বেশিরভাগ নেতাকেই আবার নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে দলের ভেতরে আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেও আওয়ামী লীগকে ঘিরে আলোচনা হয়েছে। ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী জামায়াত জোট- দুই দলের সদস্যরাই আওয়ামী শাসনামলের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, দমন-পীড়ন ও গুম-খুনের অভিযোগ তুলে ধরেছেন।
আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়ে বিএনপি নেতারা বলেছেন, তাদের অবস্থান পুরোপুরি আইনের পক্ষে। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় থাকায় তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম চালানোর সুযোগ নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও একই অবস্থান জানিয়েছেন।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিষয়ে সরকার আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। নিষিদ্ধ কোনো দলকে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।’
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপি একদিকে কঠোর অবস্থান বজায় রাখলেও অন্যদিকে কৌশলগতভাবে পরিস্থিতিকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগাচ্ছে। তারা জনগণের আস্থা অর্জনে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত বদল করতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিশেষ করে স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে তারা আওয়ামী বিরোধী কট্টর অবস্থান নিতে চাইছে না।
তৃণমূল পর্যায়ের বিএনপি নেতাদের মধ্যে এখনো শেখ হাসিনার শাসনামল নিয়ে প্রবল ক্ষোভ থাকায় আওয়ামী লীগের দ্রুত রাজনীতিতে ফিরে আসা সহজ হবে না।
বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, আওয়ামী লীগ প্রশ্নে ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং বিরোধী জামায়াত জোট নিজ নিজ রাজনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, আওয়ামী লীগ নিজেই রাজনীতিতে ফেরার জন্য প্রস্তুত কি না- এটিই এখন মূল প্রশ্ন।
তিনি আরও বলেন, ‘দলটির অনেক শীর্ষ নেতাই বর্তমানে দেশের বাইরে আছেন এবং সেখান থেকে কঠোর বক্তব্য দিচ্ছেন, যা দেশে অবস্থানরত দলের নেতাকর্মীদের সন্তুষ্ট করতে পারছে না। আগে ঠিক করতে হবে দেশে থেকে কে দলকে নেতৃত্ব দেবে, তারপরই রাজনীতিতে ফেরার বিষয়টি ভাবা সম্ভব।’
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির মতো দলগুলো আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার সম্ভাবনা একেবারেই নাকচ করে দিয়েছে। তাদের দাবি, গণহত্যাসহ নানা অভিযোগে দলটি দেশের ভেতরে ও বাইরে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী মহাসচিব আহসানুল মাহবুব যুবায়ের বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত আওয়ামী নেতাদের বিচার চলছে এবং দলটি নিষিদ্ধ রয়েছে। তাই তাদের রাজনীতিতে ফেরার কোনো সুযোগ নেই।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘জুলুমকারী দলের ফিরে আসার যেকোনো চেষ্টা জনগণের কঠোর রাজনৈতিক প্রতিরোধের মুখে পড়বে।’
একইভাবে এনসিপির সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগ তাদের জনবিরোধী কর্মের জন্যই রাজনীতি করার অধিকার হারিয়েছে। বিএনপি যদি তাদের ফেরার সুযোগ দেয়, তাহলে তাদেরও কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
এদিকে আওয়ামী লীগের ভেতরেও পরিস্থিতি খুবই নাজুক। অনেক স্থানীয় নেতা আত্মগোপনে আছেন বা মামলায় জড়িয়ে পড়েছেন। এতে সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিদেশ থেকে সামাজিক মাধ্যমে অনেক নেতাই দেশের কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তবে তা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন তৃণমূল নেতারা।
কর্মীরা বলছেন, দলকে একত্রে ধরে রাখার মতো কার্যকর নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। কেউ কেউ নতুন প্রজন্মের কাছে দলের ভার ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শও দিচ্ছেন, যাতে বিতর্কিত নেতাদের সরিয়ে নতুন নেতৃত্ব আনা যায়।
এমনকি কেউ কেউ দলের প্রধান শেখ হাসিনাকে ছাড়াই দল পুনর্গঠনের কথাও ভাবছেন। অথবা অন্তত কিছু সময়ের জন্য তাকে সক্রিয় নেতৃত্ব থেকে দূরে রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন। কেউ আবার অতীতের কর্মকাণ্ডের জন্য প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশের কথাও বলছেন।
তবে দলের শীর্ষ নেতারা এসব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের ভাষায়, শেখ হাসিনাই দলের মূল শক্তি এবং ভবিষ্যতের নেতৃত্বও তার হাতেই থাকবে।
দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ এফ এম বাহাউদ্দিন নাসিম বলেছেন, সরকার যদি গণতান্ত্রিক নীতি মেনে চলে, তাহলে আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ দেওয়া উচিত। একইসঙ্গে তিনি নেতৃত্ব পরিবর্তনের কথাও নাকচ করেছেন।
সব মিলিয়ে আইনি বাধা, দলের ভেতরের সংস্কার, তৃণমূলের ঐক্য এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর কৌশলসহ অনেক কিছুর ওপর এখন আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
বর্তমান বাস্তবতা হলো- নানা বাধা, নেতৃত্ব সংকট এবং বিরূপ রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যে দলটির আবার শক্ত অবস্থানে ফিরে আসার পথ দীর্ঘ এবং প্রায় অনিশ্চিত।


