বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছে। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এই পদ্ধতির বাস্তবায়ন এবং এর প্রয়োগ নিয়ে রীতিমতো মেরুকরণ তৈরি হয়েছে।
যারা এই পদ্ধতির সমর্থন করছেন তারা বলছেন, পিআর পদ্ধতি চালু হলে সংসদে প্রতিনিধিত্বের হার আরও ন্যায্য হবে। এক্ষেত্রে কোনো দল যত শতাংশ ভোট পাবে, ঠিক তত শতাংশ আসন পাবে। এর ফলে বড় দলের একচ্ছত্র ক্ষমতা কমবে এবং ছোট দলগুলোর কণ্ঠস্বর জোরালো হবে।
তবে সমালোচকরা মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এখনো পিআর পদ্ধতির জন্য প্রস্তুত নয়। তারা বলছেন, এই পদ্ধতি সরকারকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে ফেলতে পারে। উদাহরণ হিসেবে নেপাল, ইতালি ও বেলজিয়ামের মতো দেশগুলোর কথা বলা হচ্ছে। যেখানে পিআর পদ্ধতি বারবার সরকারের পতন ঘটিয়েছে, অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছে বলে মনে করা হয়।
সম্প্রতি এ বিষয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে জরিপ চালায় ইনোভিশন কনসাল্টিং। সেখানে দেখা গেছে, ১০ হাজার ৪১৩ জন ভোটারের মধ্যে ৫৬ শতাংশই পিআর পদ্ধতি সম্পর্কে জানেন না। যারা জানেন তাদের মধ্যে উচ্চকক্ষে পিআর চালুর বিষয়ে মত দিয়েছেন ২১ দশমিক ৮ শতাংশ, আর বিপক্ষে মত দিয়েছেন ২২ দশমিক ২ শতাংশ।
এক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে, তরুণ বা জেন-জি ভোটারদের মধ্যে এই পদ্ধতির প্রতি সমর্থন বেশি। যা নির্বাচনী সংস্কার নিয়ে প্রজন্মগত পার্থক্যকেই নির্দেশ করে।
যারা এই পদ্ধতির বিরোধীতা করছেন তারা রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল কয়েকটি দেশের উদাহরণ টানছেন।
যার মধ্যে শুরুতেই রয়েছে প্রতিবেশী নেপালের নাম। ২০০৮ সালে মিশ্র পিআর পদ্ধতি চালু করার পর দেশটিতে মাত্র ১৭ বছরে ১২টি সরকার পরিবর্তন হয়েছে। নেপালের সংসদকে প্রায়ই ‘পরিবর্তনশীল জোটের বাজার’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রতীক।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে পিআর ব্যবহার করছে ইতালি। এই দেশে ৮০ বছরে ৬৯টি মন্ত্রিসভা গঠন হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতি প্রশাসনের গড় মেয়াদ ছিল এক বছরের সামান্য বেশি।
পিআর পদ্ধতির কারণে বেলজিয়াম একবার সরকার গঠনে ৫৪১ দিনের অচলাবস্থার বিশ্ব রেকর্ড করেছিল। এমনকি তুলনামূলক স্থিতিশীল দেশ নেদারল্যান্ডসকেও ২০২১ সালের নির্বাচনের পর জোট গঠন করতে ২৯৯ দিন সংগ্রাম করতে হয়েছে।
পিআর নিয়ে আলোচনার এই কালে আফ্রিকার লেসোথোর মিশ্র সদস্য সংখ্যানুপাতিক (MMP) পদ্ধতির অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হচ্ছে। ২০০২ সালে এই পদ্ধতির লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো। কিন্তু উল্টো এটি দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে। ২০১২ সাল থেকে লেসোথোয় একের পর এক জোট সরকার অকালে ভেঙে পড়ে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সামরিক হস্তক্ষেপের ফলে সেখানে বারবার আঞ্চলিক হস্তক্ষেপেরও প্রয়োজন হয়েছে।
বাংলাদেশে গত ৩১ জুলাই জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এক সিদ্ধান্তে জানায়, জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ হবে ১০০ আসন বিশিষ্ট। এই সদস্যরা মনোনীত হবেন সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে। তবে এই সিদ্ধান্তের বিপরীতে নোট অব ডিসেন্ট দেয় বিএনপি ও সমমনা দলগুলো।
অন্যদিকে, পিআর-এর সমর্থনের নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ কিছু সমমনা দল। যারা আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই পদ্ধতি প্রয়োগের দাবিতে বিক্ষোভও করেছে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা দমন এবং রাজনৈতিক দুর্নীতি মোকাবিলায় পিআর অপরিহার্য।’
‘রাজনৈতিক সহিংসতা এবং অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতায় জর্জরিত একটি দেশে, পিআর ন্যায্য এবং আরও জবাবদিহিমূলক শাসনের দিকে পথ দেখায়।’
জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের একটি অংশের গঠন করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষে পিআর চালুর পক্ষে। কিন্তু নিম্নকক্ষে আবার এর অন্তর্ভুক্তির বিপক্ষে।
এনসিপির যুগ্ম প্রধান সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহিন বলেন, ‘উচ্চকক্ষে পিআর বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্বকে শক্তিশালী করবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করবে। এটি নিশ্চিত করবে যে, কোনো সিদ্ধান্তই জনস্বার্থ বা বিরোধী দলের কণ্ঠস্বরকে উপেক্ষা করে নেওয়া হবে না।’
তবে, বিএনপি ও তার মিত্ররা পিআর পদ্ধতির ঘোর বিরোধী। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা পিআর পদ্ধতির পক্ষে নই। পিআর ব্যবহারকারী দেশগুলোতে প্রায়ই অস্থিতিশীল সরকারব্যবস্থা সৃষ্টি হয়।’
তিনি যুক্তি দেন যে বাংলাদেশের উচিত এ মুহূর্তে পরীক্ষা-নিরীক্ষার চেয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
এসব রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন যে, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিই পিআর পদ্ধতির সঙ্গে সামাঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচনী সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার এই প্রস্তাবের গুণাগুণ এবং ঝুঁকি দুটোই স্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে, আমরা আপাতত শুধুমাত্র উচ্চকক্ষে পিআর প্রবর্তনের প্রস্তাব করেছি। এক বা দুটি দল ভিন্নমত পোষণ করলেও বেশিরভাগ দলই সম্মত হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মানসিকতা এবং দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এখনও উভয় কক্ষে পিআরের জন্য প্রস্তুত নয়। এর ইতিবাচক দিকগুলো জেনে আমি দীর্ঘদিন ধরে এটি প্রবর্তনের পক্ষে কথা বলছি।’
তার মতে, পিআর পদ্ধতিতে একনায়কতন্ত্রের উত্থানের সুযোগ খুব কম থাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মামুন আল মোস্তফা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোয় স্বজনপ্রীতি প্রবল। উদাহরণ হিসেবে বলেন, সংরক্ষিত নারী আসন বরাদ্দের কথা।
তিনি বলেন, ‘আগে এই আসনগুলো সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মীদের পরিবর্তে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু বা চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বদের দেওয়া হতো। পিআর চালু হলে, দলগুলো সম্ভবত একই কাজ করবে।’
ছোট দলগুলো পিআর-এর জন্য চাপ দিচ্ছে উল্লেখ করে এই শিক্ষক বলেন, ‘কারণ তাদের সরাসরি নির্বাচনে জেতার মতো জনপ্রিয়তা বা সক্ষমতার অভাব রয়েছে। তারা পিআর-কে সংসদে নিশ্চিত আসন পাওয়ার একটি শর্টকাট হিসেবে দেখছে।’
অধ্যাপক মামুন আল মোস্তফা সতর্ক করে বলেন, দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক জবাবদিহিতা উন্নত না হলে পিআর প্রবর্তন নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে এবং প্রতিনিধিত্বের উদ্দেশ্যকে বিকৃত বা ব্যাহত করতে পারে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘পদ্ধতি পরিবর্তন করার আগে আমাদের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও জবাবদিহি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আরেক অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমি একমত যে নিম্নকক্ষের জন্য এই মুহূর্তে পিআর পদ্ধতি চালু করা সম্ভব নয়। বেশিরভাগ সাধারণ নাগরিক এটি বুঝবেন না।’
উচ্চকক্ষে পিআর সম্পর্কে তার মত হলো, এটি ছোট রাজনৈতিক দল এবং পেশাজীবীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সহায়তা করতে পারে। যা সিস্টেমে এক ধরনের ভারসাম্য তৈরি করবে।


