পাকিস্তানের মতো ভারত ‘দালাল’ রাষ্ট্র নয়: জয়শঙ্করের মন্তব্যে বিতর্ক

পাকিস্তানের মতো ভারত ‘দালাল’ রাষ্ট্র নয়: জয়শঙ্করের মন্তব্যে বিতর্ক
Advertisement
Advertisement

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ নিয়ে চলতি সপ্তাহের শুরুতে আয়োজিত এক সর্বদলীয় বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর বলেছেন, ভারত পাকিস্তানের মতো কোনো ‘দালাল’ রাষ্ট্র নয়। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে বসাতে পাকিস্তান যে ধরনের কাজ করছে, ভারত তেমন করছে না।

বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল—যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান, উভয়ের সঙ্গেই সুসম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধ থামাতে ভারত কিছুই করছে না। এর জবাবে জয়শঙ্কর বলেন, ‘ভারত পাকিস্তানের মতো কোনো দালাল রাষ্ট্র নয়।’ তিনি আরও মন্তব্য করেন, ভারতের চেয়ে কম কূটনৈতিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান এই সুযোগটি লুফে নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য আলোচনার আয়োজক হিসেবে পাকিস্তান এখন সামনের সারিতে। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইসলামাবাদের এই ভূমিকাকে সমর্থন জানিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। বিরোধী দলীয় নেতারা বলেন, বিশ্বমঞ্চে ভারত এর আগে কখনো বর্তমানের মতো এতখানি একা হয়ে পড়েনি।

কংগ্রেস নেতা তারিক আনোয়ার বিজেপি সরকারের সমালোচনা করে বলেন, পাকিস্তান যখন মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিচ্ছে, তখন আমরা ‘নির্বাক দর্শক’ হয়ে আছি। তিনি এ বিষয়ে সংসদে পূর্ণাঙ্গ বিতর্কের দাবি জানান।

তবে জয়শঙ্কর বলেন, পাকিস্তানের এমন ভূমিকায় ‘নতুন কিছু নেই’। ১৯৮১ সাল থেকেই তারা দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে ‘ব্যবহৃত’ হচ্ছে। তার মতে, ইসলামাবাদ কোনো প্রকৃত মধ্যস্থতাকারী নয়; তারা কেবল এক পক্ষ থেকে অন্য পক্ষে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘এজেন্ট’ বা প্রতিনিধি মাত্র।

ভারত হাত গুটিয়ে বসে আছে—এমন অভিযোগ অস্বীকার করে জয়শঙ্কর জানান, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইতিমধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার তাগিদ দিয়েছেন এবং জোর দিয়ে বলেছেন যে এই সংঘাত সবারই ক্ষতি করছে। নয়াদিল্লি এই সংকটে নীরব রয়েছে—বিরোধীদের এমন দাবিও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।

জয়শঙ্কর দাবি করেন, সরকার যথাযথ প্রটোকল মেনে চলছে। মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর ভারতের প্রতিক্রিয়া জানাতে দেরি হয়েছে বলে যে অভিযোগ উঠেছিল, তার জবাবে তিনি জানান, ইরানি দূতাবাস খোলার পরপরই পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি সেখানে গিয়ে শোক বইয়ে স্বাক্ষর করেছেন।

‘দালাল’ মন্তব্যে পাকিস্তানে ক্ষোভ

জয়শঙ্করের ‘দালাল’ কটাক্ষে পাকিস্তানে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। ভারতীয় মন্ত্রীর এই মন্তব্যকে পাকিস্তানের প্রতি ‘হিন্দু উগ্র জাতীয়তাবাদী’ দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন অনেকে। পাকিস্তানের দৈনিক ডন-এর এক প্রতিবেদন জানিয়েছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফের মতে, জয়শঙ্করের এমন মন্তব্য তার ‘ব্যক্তিগত হতাশার’ প্রতিফলন।

প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারির মুখপাত্র মুর্তজা সোলাঙ্গি মন্তব্য করেন, জয়শঙ্কর একটি ‘আত্মঘাতী ভাইরাসে’ আক্রান্ত। তিনি কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সবকিছুই ভুলে গেছেন।

আরও পড়ুন

সিন্ধুর সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ জুবায়ের বলেন, ভারত এই যুদ্ধে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না বলেই জয়শঙ্কর এত নিচে নেমে মন্তব্য করছেন। সাবেক মন্ত্রী খুররম দস্তগীর খান তার এমন ভাষাকে ‘নিন্দনীয়’ বলে অভিহিত করেন। ২০২৫ সালের মে মাসের যুদ্ধে হিন্দুত্ববাদী ঔদ্ধত্যের জন্য পাকিস্তান ছিল এক ভয়ংকর প্রতিপক্ষ, এখনও তেমনই রয়েছে।

পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সমন্বয়ক রানা এহসান আফজাল খান বলেন, পাকিস্তান যখন কাজ করে দেখাচ্ছে, ভারত তখন কেবল মুখে বড় কথা বলছে এবং ‘ইসরায়েলের কোলে বসে আছে’।

পাকিস্তানি সাংবাদিক ঘারিদা ফারুকি এই মন্তব্যকে ‘উদ্ভট’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ভারত এখন হতাশ ও জনবিচ্ছিন্ন।

সাবেক ইরানি কূটনীতিক মেহরদাদ খোনসারি এশিয়া ওয়ান টিভিকে বলেন, জয়শঙ্করের মন্তব্য ‘অনভিপ্রেত ও চাতুর্যপূর্ণ’। তার মতে, ভারত জ্বালানি ও হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তার জন্য শান্তির ওপর নির্ভরশীল, তাই পাকিস্তানের এই উদ্যোগকে ভারতের স্বাগত জানানো উচিত ছিল।

ওয়াশিংটনভিত্তিক উইলসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যানও পাকিস্তানের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন।

আলোচনা আয়োজনের প্রস্তাব পাকিস্তানের

ইরান সংঘাত শুরুর পর থেকেই পাকিস্তান সক্রিয় কূটনীতি চালিয়ে যাচ্ছে এবং অন্তত ছয়টি বার্তা আদান-প্রদান করেছে। রয়টার্সের সূত্রমতে, সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তিতে পাকিস্তান দায়বদ্ধ থাকলেও তেহরানের সঙ্গে নেপথ্য আলোচনার মাধ্যমে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো এড়াতে চাইছে তারা।

প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামাবাদকে আলোচনার স্থান হিসেবে প্রস্তাব করেছেন। এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিকে ট্যাগ করে তিনি লিখেন, ‘উভয় পক্ষ রাজি থাকলে পাকিস্তান এই ঐতিহাসিক আলোচনার আয়োজন করতে প্রস্তুত।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এই আলোচনার প্রস্তাব সম্ভবত ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকেই এসেছে। তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন যে, মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান মানেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা নয়।

ভারতীয় মধ্যস্থতার পক্ষে ডগলাস ম্যাকগ্রেগর

অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন কর্নেল ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডগলাস ম্যাকগ্রেগর অবশ্য পাকিস্তানের এই প্রস্তাবকে ‘হাস্যকর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। এএনআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তারা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিশ্বাসযোগ্য নয়। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের সাহায্যের হাত বাড়ানো অনেকটা পোড়া বাড়িতে দাঁড়িয়ে খালি ঘর দিতে চাওয়ার মতো।’ তার মতে, ইসরায়েল কখনোই পাকিস্তানকে নিরপেক্ষ মনে করবে না। বরং সমস্যার অংশ মনে করবে।

ইসলামাবাদে কোনো ধরনের আলোচনার আয়োজন করাও ‘অবাস্তব’। তিনি বলেন, ইসলামাবাদে আলোচনা হবে জানলে ইসরায়েলিরা হাসবে।

ভারতের অবস্থান

জয়শঙ্করের এই তিক্ত মন্তব্যের মূলে কেবল পশ্চিম এশিয়ার কূটনীতি নয়, বরং কাশ্মীর ও সীমান্ত সন্ত্রাস নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের চিরস্থায়ী বিরোধ কাজ করছে। মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদের রপ্তানিকারক হিসেবে তুলে ধরা এবং আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে করা নয়াদিল্লির অন্যতম প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের প্রতি এই কঠোর মনোভাবের গভীরে রয়েছে ভারতের অভ্যন্তরীণ হিন্দু-মুসলিম রাজনীতির সমীকরণ। ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের আমলে অনেক সময় ধর্মীয় মেরুকরণকে নির্বাচনে জেতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সংঘাতময় পরিস্থিতিতে প্রায়ই মুসলিমদের ‘পাকিস্তানে চলে যাও’ বলে কটাক্ষ করা হয়।

জয়শঙ্করের সাম্প্রতিক এই মন্তব্যও নয়াদিল্লির সেই চিরচেনা ‘পাকিস্তান-কেন্দ্রিক’ পররাষ্ট্রনীতিরই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর