নির্বাচন-পরবর্তী ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের সামনে কঠিন পথ

নির্বাচন-পরবর্তী ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের সামনে কঠিন পথ
Advertisement
Advertisement

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ভূমিধস জয় পেয়েছে। ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রায় ২১২টি আসনে জয় পেয়ে বিএনপি জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের মতো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।

ইসলামপন্থী জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্ররা শক্তিশালী ফলাফল দেখিয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, তারা প্রায় ৬৮–৭৭টি আসন পেয়েছে (জামায়াতের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সাফল্য)। ছাত্রনেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং অন্যান্য দল কিছু আসন পেয়েছে।

এই নির্বাচন ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম বড় রাজনৈতিক মাইলফলক। গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয় এবং আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে নিষিদ্ধ করা হয়। বছরের পর বছর অস্থিরতার পর এই নির্বাচন বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। অনেক এলাকায় উচ্চ ভোটার উপস্থিতি ও শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ দেখা গেছে।

২০২৪ সালের আগস্টের অভ্যুত্থান, শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয়, সীমান্ত ইস্যু এবং ভারতের হস্তক্ষেপের ধারণা—এসব কারণে টানাপোড়েনে থাকা ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন বিএনপি নেতৃত্বের অধীনে কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ দেখাচ্ছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দ্রুত তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে গণতান্ত্রিক অগ্রগতি, বহুমাত্রিক সম্পর্ক জোরদার ও যৌথ উন্নয়ন লক্ষ্যের আশা প্রকাশ করেন। তারেক রহমান পারস্পরিক সম্মান এর ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন এবং তিস্তা পানি বণ্টন, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা ও হিন্দু সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার মতো জটিল ইস্যুতে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছেন—যা ভারতের উদ্বেগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

পারস্পরিক সন্দেহ

তবে সম্পর্ক পুনর্গঠনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে গভীর পারস্পরিক সন্দেহ ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা আছে। ভারতীয় নেতৃত্ব ও বিশ্লেষকরা প্রায়ই পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা সন্দেহের চোখে দেখে, বিশেষ করে সিলিগুড়ি করিডোর (চিকেন নেক) সংলগ্ন কৌশলগত স্বার্থের কারণে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের অনেকেই ভারতকে আধিপত্যবাদী হিসেবে দেখেন—অর্থনৈতিক প্রভাব, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা বা অতীতে শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থনের প্রেক্ষাপটে। গণমাধ্যমে বিভিন্ন ঘটনার বাড়াবাড়ি প্রচার দুই দেশের জনগণের উদ্বেগ বাড়ায়, ফলে নেতৃত্বের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ইতিবাচক বার্তা টেকসই করা কঠিন হয়।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা

বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা ভারতীয় স্বার্থের সঙ্গে বাস্তববাদী সমঝোতার সুযোগ তৈরি করতে পারে, যাতে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় থাকে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য শক্তিশালী রয়েছে; ২০২৪–২৫ অর্থবছরে কিছু বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তবে শক্তিশালী জামায়াত-নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল (যাদের মধ্যে ভারতবিরোধী উপাদান রয়েছে) এবং এনসিপি (ভারতে শেখ হাসিনার আশ্রয় নিয়ে ক্ষুব্ধ) বিএনপিকে বড় ছাড় না দিতে চাপ দিতে পারে। জামায়াতের ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তান-ঘেঁষা অবস্থান ইসলামাবাদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের পক্ষে চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা ভারতের একক প্রভাবের প্রত্যাশাকে জটিল করে তুলবে।

আরও পড়ুন

সুতরাং, নয়াদিল্লিকে এখন কেবল ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে নয়, বরং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে স্বীকৃতি দিয়ে এগোতে হবে।

প্রত্যর্পণ দাবি

২০২৪ সালের দমন-পীড়নের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা এখনো ভারতে অবস্থান করছেন। বিএনপি আইনি ও কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে তার প্রত্যর্পণের দাবি পুনরায় জোরদার করেছে, এটিকে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখছে।

কিন্তু ভারত যুক্তি দিচ্ছে যে অভিযোগগুলো রাজনৈতিক এবং অতীত সহযোগিতার কারণে তাদের নৈতিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। এতে বড় কূটনৈতিক জট তৈরি হয়েছে। প্রত্যর্পণ না করলে বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।

পানি বণ্টন বিরোধ

৫৪টি অভিন্ন নদী নিয়ে পানি বণ্টন দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যু।
১৯৯৬ সালের গঙ্গা (ফারাক্কা) পানি চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হবে। বাংলাদেশ অভিযোগ করে যে ফারাক্কা থেকে তথ্য ভাগাভাগিতে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে এবং শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি, মরুকরণ ও সুন্দরবনের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ভারত জলবায়ু পরিবর্তন, পানির প্রবাহ হ্রাস ও নিজস্ব প্রয়োজনের কথা তুলে ধরে পুনরায় আলোচনার কথা বলছে—যা বাংলাদেশের জন্য কম বরাদ্দের আশঙ্কা তৈরি করছে। তথ্য আদান-প্রদান নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে, তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছাই এখানে মূল।

তিস্তা চুক্তি এক দশকের বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে (পানির ঘাটতির আশঙ্কায়)। এটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিস্তা-সংক্রান্ত প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াচ্ছে।

ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য

বাংলাদেশ ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিতে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগ (যেমন মংলা বন্দর) এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে বৈচিত্র্য আনছে। ভারত যদি প্রতিটি পদক্ষেপ ঠেকাতে চায়, তবে তা উল্টো ফল দিতে পারে।

অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা স্থিতিশীলতার ভিত্তি

রাজনৈতিক টানাপোড়েন সত্ত্বেও বাণিজ্য শক্তিশালী রয়েছে—প্রায় ৪,০০০ কিলোমিটার সীমান্ত, স্বল্প খরচে স্থলপথ এবং পারস্পরিক সরবরাহ শৃঙ্খল (যেমন তৈরি পোশাক ও জুতা শিল্পে ভারতীয় কাঁচামাল) এর পেছনে কারণ। ভারত থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি আমদানি এবং অবকাঠামোগত সংযোগ সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখছে; সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা বাস্তবসম্মত নয়।

সব মিলিয়ে, নরেন্দ্র মোদি ও তারেক রহমানের বন্ধুত্বপূর্ণ বার্তা আশাবাদ তৈরি করলেও সফলতার জন্য জরুরি ভিত্তিতে পানি চুক্তির সমাধান (বিশেষত গঙ্গা চুক্তি নবায়ন), শেখ হাসিনার বিষয়টি সূক্ষ্মভাবে মীমাংসা, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড কমানো, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।
প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি ও গণমাধ্যম-চালিত জাতীয়তাবাদ অতিক্রম না করলে বাস্তব অগ্রগতি কঠিনই থেকে যাবে।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর