রবির বিরুদ্ধে বাংলালিংকের করা ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা এবং একীভূতকরণের শর্ত ভঙ্গের অভিযোগে প্রতিকার চেয়ে করা এক রিটের পর এক দশকের পুরোনো একটি টেলিকম বিরোধ সম্প্রতি নতুন করে সামনে এসেছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রতিযোগীদের শক্ত আইনি পদক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার চাপের মুখেই রবি আজিয়াটা তার ১৬ বছরের পুরোনো ব্র্যান্ড এয়ারটেলকে ‘সার্কেল’ বানিয়ে ফেলেছে।
রবি আজিয়াটা পিএলসি গত ১৭ আগস্ট তাদের তারুণ্য-কেন্দ্রিক ব্র্যান্ড এয়ারটেলের রিব্র্যান্ডিংয়ের সময় বলে, ‘পরিবর্তিত ডিজিটাল বাস্তবতা এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান সংযুক্ত জীবনধারার কথা মাথায় রেখে’ নতুন ব্র্যান্ডটি তৈরি করা হয়েছে।
তবে টাইমস অব বাংলাদেশের পর্যালোচনা করা নথি বলছে, গত এক বছরে প্রতিযোগী গ্রামীণফোন ও বাংলালিংকের আইনি পদক্ষেপ এবং অভিযোগ এই সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
রবির মুখপাত্ররা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে রবির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা প্রতিযোগীদের পদক্ষেপের কারণে রিব্র্যান্ডিংয়ের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘রিব্র্যান্ডিং একটি স্বাভাবিক ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া।’
বিরোধের সূত্রপাত ২০১৬ সালে, যখন রবি আজিয়াটা ও এয়ারটেল বাংলাদেশ একীভূত হয়ে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোবাইল অপারেটরে পরিণত হয়।
উচ্চ আদালত অনুমোদিত একীভূতকরণ পরিকল্পনায় রবির ওপর কয়েকটি শর্ত আরোপ করা হয়েছিল। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন ও আদালতে প্রতিযোগীদের দেওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, এর মধ্যে একটি শর্ত ছিল–একীভূত প্রতিষ্ঠানের সব সেবা রবি আজিয়াটা নামেই পরিচালনা করতে হবে।
প্রতিযোগীদের দাবি, এর অর্থ ছিল একীভূত হওয়ার পর এয়ারটেল ব্র্যান্ড বন্ধ করতে হবে।
এ ছাড়া, একীভূতকরণের শর্তে এয়ারটেলের ০১৬ নম্বর সিরিজ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা ছিল। নিয়ন্ত্রক অনুমোদন ছাড়া একীভূত হওয়ার দুই বছরের বেশি সময় এই সিরিজ ব্যবহার করা যাবে না বলে শর্ত ছিল।
গ্রামীণফোন (জিপি) ও বাংলালিংকের অভিযোগ, শর্ত ভেঙ্গে রবি প্রায় এক দশক ধরে রবি ও এয়ারটেল–দুটি ব্র্যান্ড নিয়ে ব্যবসা করেছে।
তাদের দাবি, এয়ারটেল ব্র্যান্ডের মাধ্যমে রবি বাজারে বাড়তি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পেয়েছে।
২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর গ্রামীণফোন বিটিআরসিকে চিঠি দিয়ে একীভূতকরণের শর্ত বাস্তবায়নের দাবি জানায়। এরপর ৩০ অক্টোবর একই দাবি জানিয়ে বিটিআরসিকে চিঠি দেয় বাংলালিংক।
বাংলালিংকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিটিআরসি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় তারা ২০২৬ সালের ২৭ এপ্রিল উচ্চ আদালতে রিট করে। এতে তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিষ্ক্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ করে।
টাইমসের হাতে আসা নথি অনুযায়ী, রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০ মে বিটিআরসি রবি আজিয়াটাকে গ্রামীণফোন ও বাংলালিংকের উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে জবাব দিতে বলে। এরপর বিরোধ আরও তীব্র হয়।
৮ জুলাই ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ আদালতে রবি আজিয়াটার বিরুদ্ধে ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা করে বাংলালিংক।
মামলায় বাংলালিংক অভিযোগ করেছে, প্রায় এক দশক এয়ারটেল ব্র্যান্ড চালিয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘ সময় ০১৬ নম্বর সিরিজ ব্যবহার করার মাধ্যমে রবি অন্যায্য প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পেয়েছে। এর ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়েছে।
মামলায় ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি মামলা করার দিন থেকে অর্থ পরিশোধ পর্যন্ত ১৫ শতাংশ হারে বার্ষিক সুদ, মামলার খরচ এবং অন্যান্য প্রতিকার চাওয়া হয়েছে।
যোগাযোগ করা হলে, এক লিখিত বিবৃতিতে বাংলালিংক টাইমসকে বলে, ‘এয়ারটেল বন্ধ করা ছিল আদালত অনুমোদিত মূল একীভূতকরণ শর্তের অংশ। প্রায় ১০ বছর ধরে এই ব্র্যান্ড চালু রাখা একটি অনাকাঙ্ক্ষিত রেগুলেটরী পরিবেশের দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।’
প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, ‘আমাদের উদ্বেগ এয়ারটেল ব্র্যান্ডের নাম নিয়ে ছিল না। উদ্বেগ ছিল একটি লাইসেন্সের অধীনে একটি অপারেটরের দুটি পৃথক ব্র্যান্ড পরিচালনার মাধ্যমে তৈরি হওয়া প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা নিয়ে।’
বাংলালিংকের দাবি, রবি ও এয়ারটেলের মত দুটি আলাদা মূল ব্র্যান্ড একই সঙ্গে পরিচালনার মাধ্যমে রবি ভিন্ন ভিন্ন গ্রাহক শ্রেণিকে টার্গেট করতে পেরেছে এবং আলাদা বাজার অবস্থান তৈরি করার সুযোগ পেয়েছে–যে সুবিধা একক ব্র্যান্ডে পরিচালিত প্রতিযোগীদের ছিল না।
প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছে, সার্কেল রিব্র্যান্ডিং তাদের মূল উদ্বেগ সমাধান করেছে কি না, তা তারা পর্যালোচনা করবে।
‘বাংলালিংক একটি ন্যায্য ও সমান প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে প্রতিযোগিতা ও উদ্ভাবনকে সমর্থন করে’, প্রতিষ্ঠানটি বলেছে।
২০১৬ সালের রবি-এয়ারটেল একীভূতকরণ ছিল বাংলাদেশের টেলিকম খাতে সবচেয়ে বড় একীভূতকরণ।


