অবশেষে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের ঘোষণা দিলেন আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ফুটবলার লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসরের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন ৩৯ বছর বয়সী এই তারকা।
সোমবার নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে মেসি তার সিদ্ধান্তের কথা জানান। সেখানে তিনি লেখেন, ‘ফাইনালের পর এতদিন সময় যাওয়ার পর, অনেক ভেবেচিন্তে, আমি আপনাদের জানাতে চাই, আমি জাতীয় দল থেকে অবসর নিচ্ছি…।’
মেসির এমন ঘোষণায় আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে তার দীর্ঘ ও বর্ণিল অধ্যায়ের ইতি ঘটতে যাচ্ছে। জাতীয় দলের জার্সিতে দীর্ঘদিন ধরে আর্জেন্টিনার হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসির ক্যারিয়ার সাফল্যে ভরা। তার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপসহ গুরুত্বপূর্ণ শিরোপা জিতেছে। জাতীয় দলের হয়ে তার অসাধারণ পারফরম্যান্স তাকে আর্জেন্টাইন ফুটবলের অন্যতম সেরা কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে।
বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হারের পর থেকেই লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল। নিউ জার্সির স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সেই ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের করা গোলে শিরোপা হাতছাড়া করে আর্জেন্টিনা।
তবে ম্যাচ শেষ হওয়ার পরই জাতীয় দল ছাড়ার ঘোষণা দেননি মেসি। বরং ২১ জুলাই এক বার্তায় তিনি জানান, ফাইনালের পরের হতাশা ও কষ্ট কাটিয়ে উঠতে তার কিছুটা সময় প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে দলের পথচলা এবং সমর্থকদের অকুণ্ঠ ভালোবাসার স্মৃতিকে গুরুত্ব দেন তিনি। তখনও জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ঘোষণা দেননি আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
এর মধ্যে ব্যক্তিগত জীবনেও বড় ধাক্কা আসে মেসির। গত ৮ আগস্ট মারা যান তার বাবা ও দীর্ঘদিনের এজেন্ট হোর্হে মেসি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। বাবাকে হারানোর পর নিজের ফুটবল ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কথাও জানিয়েছিলেন মেসি। ধারণা করা হচ্ছিল, এই ঘটনাও তার অবসরের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।
শেষ পর্যন্ত সেই জল্পনার অবসান ঘটিয়ে আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা জানালেন তিনি।
নিজের বিদায়ী বার্তায় মেসি জানান, দীর্ঘ সময় ধরে বিষয়টি নিয়ে ভেবেছেন তিনি। জাতীয় দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া তার জন্য সহজ ছিল না, বরং অত্যন্ত আবেগের। তারপরও বর্তমান পরিস্থিতিতে এটিই সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে হয়েছে তার কাছে।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার কথাও স্মরণ করেছেন মেসি। তার বক্তব্যে উঠে এসেছে, শুধু শিরোপা জয়ের সময় নয়, ক্যারিয়ারের শুরু থেকে প্রতিটি ম্যাচেই দেশের হয়ে নিজের সামর্থ্যের পুরোটা উজাড় করে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি।
জাতীয় দলের হয়ে খেলাটা মেসির কাছে সবসময়ই ছিল আবেগ ও ভালোবাসার জায়গা। তবে এখন তার মনে হচ্ছে, দলের জন্য নিজের দেওয়ার মতো আর তেমন কিছু অবশিষ্ট নেই। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের সামনে এগিয়ে আসার সুযোগ করে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।
সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতাও ছিল তার বার্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রায় দুই দশক ধরে আর্জেন্টিনার হয়ে খেলার সময় যে ভালোবাসা ও সমর্থন পেয়েছেন, সেটি আজীবন মনে রাখবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
জাতীয় দলের জার্সি পরে মাঠে নামার পরিবর্তে ভবিষ্যতে গ্যালারি থেকে প্রিয় দলকে সমর্থন করার কথা জানিয়েছেন মেসি। অর্থাৎ খেলোয়াড় হিসেবে নয়, এবার একজন সাধারণ সমর্থকের ভূমিকায় আর্জেন্টিনার ম্যাচ দেখবেন তিনি।
বিদায়ী বার্তায় পরিবার, জাতীয় দলের সতীর্থ, কোচিং স্টাফ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন মেসি। তাদের সঙ্গে কাটানো সময়কে নিজের জীবনের অত্যন্ত মূল্যবান ও স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন তিনি।
আর্জেন্টিনার হয়ে অর্জন করা শিরোপা ও তৈরি করা স্মৃতিগুলো নিয়ে নিজের গর্বের কথাও জানিয়েছেন মেসি। সতীর্থদের সঙ্গে মিলে দেশকে কিছু অসাধারণ ও স্বপ্নের মুহূর্ত উপহার দিতে পারাটাকেই নিজের বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখছেন তিনি।
বার্তার শেষদিকে নিজের দেশ ও পরিচয়ের প্রতি গভীর আবেগ প্রকাশ করেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। আর্জেন্টাইন হিসেবে জন্ম নেওয়ার জন্য সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে শেষ করেন ভালোবাসার বার্তা—‘গো আর্জেন্টিনা!’
গৌরবময় অধ্যায়ের সমাপ্তি
২০০৫ সালে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সিতে অভিষেকের পর থেকে দীর্ঘ প্রায় দুই দশক দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন মেসি। এই সময়ে বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা ও ফাইনালিসিমার মতো বড় শিরোপা জয়ের পাশাপাশি অসংখ্য ব্যক্তিগত ও দলীয় রেকর্ড গড়েছেন তিনি।
৩৯ বছর বয়সে ২০২৬ বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনার নেতৃত্ব দিয়েছেন মেসি। টুর্নামেন্টে আট গোল ও চারটি অ্যাসিস্ট করে দলের আক্রমণভাগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বলে জানিয়েছে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এএফএ)।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করে মেসি তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা পূরণ করেছিলেন। তবে চার বছর পর শিরোপা ধরে রাখার অভিযানে দলকে ফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত স্পেনের কাছে হেরে যেতে হয়।
সেই হারের কয়েক সপ্তাহ পরই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্ত প্রকাশ করলেন মেসি। ফলে স্পেনের বিপক্ষে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালই হয়ে থাকছে আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার শেষ ম্যাচ।
একটি দীর্ঘ ও গৌরবময় অধ্যায়ের এখানেই সমাপ্তি। ভবিষ্যতে মেসিকে আর আর্জেন্টিনার হয়ে মাঠে দেখা যাবে না। তবে দেশটির ফুটবলে তার অর্জন, রেকর্ড এবং রেখে যাওয়া অসংখ্য স্মৃতি বহুদিন ধরে সমর্থকদের কাছে অমলিন হয়ে থাকবে।


