যশোরের মানুষের স্মৃতিতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দিনটি একইসঙ্গে স্বৈরাচারমুক্ত হওয়ার আনন্দ এবং ভয়াবহ এক ট্র্যাজেডির সাক্ষী হয়ে আছে। সেদিন ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করলেও যশোরের চিত্রা মোড়ে অবস্থিত জাবির হোটেল ইন্টারন্যাশনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রাণ হারান অন্তত ২৪ জন। নিহতদের মধ্যে শিক্ষার্থী, হোটেল কর্মচারী এবং একজন বিদেশি নাগরিকও ছিলেন।
এই ভয়াবহ ঘটনার দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও যশোর শহরের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। বরং সরকারি তথ্যানুযায়ী, শহরে এখনো শতাধিক বহুতল ভবন ‘অতিঝুঁকিপূর্ণ’ অবস্থায় রয়েছে।
শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত জাবির হোটেলের মালিক ছিলেন আওয়ামী লীগের জেলা সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য শাহীন চাকলাদার। প্রভাবশালী এই নেতার ভবনটি কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই গড়ে তোলা হয়েছিল। চাকচিক্য থাকলেও ভবনটিতে ছিল না কোনো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বা জরুরি বহির্গমন পথ। ফায়ার সার্ভিসের তালিকায় ভবনটি আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ছিল। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ভবনটি নিয়ম মেনে নির্মাণ করা হলে সেদিন ২৪টি তাজা প্রাণ এভাবে ঝরে যেত না।
বর্তমানে চিত্রা মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই আধাপোড়া ভবনটি যেন এক নীরব সতর্কবার্তা। কিন্তু সেই ট্র্যাজেডি থেকে শিক্ষা নেয়নি কোনো পক্ষই। সরকারি তালিকায় থাকা অতিঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর মধ্যে সরকারি-বেসরকারি অফিস, বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনসহ বেশ কিছু হাসপাতালও রয়েছে।
সরেজমিনে উমেশচন্দ্র লেনের কাসাপট্টিতে অবস্থিত দশতলা মরিয়ম টাওয়ারে গিয়ে দেখা যায়, আবাসিক ভবন হিসেবে অনুমোদিত হলেও এর তিন তলা পর্যন্ত বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার হচ্ছে। সেখানে ফায়ার এক্সিট সিঁড়ি নেই, অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রগুলোর মেয়াদও ২০২৫ সালে শেষ হয়ে গেছে।
শহরের বড়বাজার, হাটচান্নি রোড ও আলুপট্টি এলাকার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ঘনবসতি ও সরু রাস্তার কারণে এসব এলাকায় প্রায়ই অগ্নিকাণ্ড ঘটে। সম্প্রতি আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী সানোয়ার হোসেন জানান, বাজারে আগুন লাগলে সবচেয়ে পানির বড় সংকট দেখা দেয়। পাশের ভৈরব নদ বা শহরের লালদীঘি থেকে পানি সংগ্রহ করা ফায়ার সার্ভিসের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি এই সংকট মোকাবিলায় পৌরসভার উদ্যোগে বাজারে নির্দিষ্ট স্থানে ‘ওয়াটার পয়েন্ট’ স্থাপনের দাবি জানান।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যশোরের সাবেক আহ্বায়ক রাশেদ খান সেই ভয়াবহ দিনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ক্ষমতার দম্ভে আইন অমান্য করে জাবির হোটেল নির্মাণ করা হয়েছিল। সেদিন আটকা পড়া মানুষগুলো বের হওয়ার পর্যাপ্ত সময় পেলেও বিকল্প পথ না থাকায় মারা গেছেন।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পরিত্যক্ত এই ভবনটি দেখে শিক্ষা নেওয়া উচিত হলেও বর্তমানে শহরে অনেক ভবন একইভাবে ঝুঁকি নিয়ে তৈরি হচ্ছে।
যুব অধিকার পরিষদ যশোরের সাধারণ সম্পাদক মিলন শেখও বলেন, শহরের নতুন বহুতল ভবনগুলোতে নিরাপত্তার বালাই নেই। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকার মতো পর্যাপ্ত রাস্তাও রাখা হচ্ছে না।
পৌর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব জিল্লুর রহমান ভিটু এই পরিস্থিতির জন্য পৌর কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকে দায়ী করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ভবন নকশা অনুমোদন এবং অগ্নিনিরাপত্তা যাচাইয়ের দায়িত্ব পৌরসভার হলেও তারা তা পালন করছে না। অনেক ক্ষেত্রে অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে অনিয়মগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া হয় বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তার মতে, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং দুর্নীতি বন্ধ না হলে এই জীবনের ঝুঁকি কাটবে না।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জনবল সংকটের দোহাই দেন যশোর পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মোরাদ আলী। তিনি জানান, একটি সিটি কর্পোরেশনের সমান বড় এই পৌর এলাকায় ভবন তদারকির জন্য মাত্র একজন নগর পরিকল্পনাবিদ ও একজন প্রকৌশলী রয়েছেন।
প্ল্যান অনুযায়ী ভবন নির্মাণ না করার প্রবণতার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি চেয়েও পাওয়া যায়নি। তবে জেলা প্রশাসনের সহায়তায় মাঝে মাঝে অভিযান চালানো হয়। পানির উৎসগুলো ঠিক রাখার কাজ চলছে বলে জানান মোরাদ আলী।
যশোর সদর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের তথ্যমতে, চলতি বছরেই এই উপজেলায় ৩০টি অগ্নিকাণ্ডে অর্ধকোটি টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
যশোরের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. ফিরোজ আহমেদ জানান, পানির তীব্র সংকট, সরু রাস্তা এবং ঘনবসতির কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে যে কোনো বড় দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।


