ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ঋণের নামে প্রায় ৯০৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বাংলাদেশ ব্যাংকের আলোচিত ডেপুটি গভর্নর মো. কবির আহাম্মদসহ ২৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
মামলায় কবির আহাম্মদের পাশাপাশি ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক পরিচালক রন হক সিকদার, পারভীন হক সিকদার ও মনোয়ারা সিকদারকেও আসামি করা হয়েছে।
রোববার দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১ এ মামলাটি দায়ের করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন।
ঋণটি অনুমোদনের সময় কবির আহাম্মদ ন্যাশনাল ব্যাংকের পর্যবেক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন ব্যাংকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিযুক্ত পর্যবেক্ষকদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতা কিংবা নীরবতার সুযোগে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতে ব্যাপক লুটতরাজ চালিয়েছে বিভিন্ন গোষ্ঠী।
মামলা প্রসঙ্গে দুদকের মহাপরিচালক আক্তার হোসেন বলেন, ব্লুম সাকসেস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামে একটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে সিভিল ওয়ার্কের ভুয়া চুক্তিপত্র ব্যবহার করে ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডে ঋণের আবেদন করা হয়। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৬০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়। ঋণের অর্থ উত্তোলন করে তা নগদ, পে-অর্ডার ও ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে স্থানান্তর করে ঋণের পুরো অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ব্লুম সাকসেস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ জালাল খান মজলিশ ও পরিচালক খাদিজা আক্তার ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ন্যাশনাল ব্যাংকের দিলকুশা শাখায় প্রতিষ্ঠানের নামে একটি হিসাব খোলেন। হিসাব খোলার দিনই বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি বড় প্রকল্পের কাজের অজুহাতে তিন বছর মেয়াদি ওডি (কার্যাদেশ) ঋণ সুবিধা হিসেবে ৬০০ কোটি টাকার আবেদন করা হয়।
আবেদনে পর্যাপ্ত জামানত দেওয়ার কথা বলা হলেও জামানতসংক্রান্ত কোনো বিস্তারিত তথ্য ছিল না বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। অনুসন্ধানের বরাতে দুদক জানিয়েছে, ঋণ আবেদনের পক্ষে দাখিল করা ‘সাব-কন্ট্রাক্ট অ্যাগ্রিমেন্ট’ ভুয়া ও জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি।
মামলায় আরও বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম–কক্সবাজার ডুয়েল গেজ রেললাইন প্রকল্প বাস্তবায়নের ‘সাব-কন্ট্রাক্ট’ হিসেবে যে চুক্তিপত্র দাখিল করা হয়েছিল, তাতে প্রকল্প পরিচালকের দপ্তরের একটি স্মারক (তারিখ: ২৯ মে ২০২৫) এবং সংশ্লিষ্ট পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় সেগুলো ভুয়া বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ঋণ আবেদন পাওয়ার পর শাখা পর্যায়ে যথাযথ যাচাই-বাছাই না করেই ঋণ প্রস্তাব প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়। নীতিমালা অনুযায়ী ক্রেডিট কমিটিতে উপস্থাপন না করে দ্রুত বোর্ড মেমো তৈরি করে অনুমোদনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়।
ঋণ অনুমোদনের পর ‘ধাপে ধাপে বিতরণ’-এর শর্ত উপেক্ষা করে এককালীন বিতরণ করা হয়। ২০১৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর থেকে ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র সাত দিনে ৫৯৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকা গ্রাহকের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। পরে ২০২০ সালের ৬ জানুয়ারি ও ৮ মার্চ আরও ৩৫ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়।
এজাহারে বলা হয়েছে, বিতরণ করা ৬০০ কোটি টাকার মধ্যে ৫২৫ কোটি টাকা ৩৭টি বেয়ারার চেকের মাধ্যমে নগদে উত্তোলন করা হয়। উত্তোলিত অর্থের একটি অংশ নগদ ও পে-অর্ডারের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে।
মামলার আসামিদের মধ্যে ব্লুম সাকসেস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ন্যাশনাল ব্যাংকের দিলকুশা শাখা ও প্রধান কার্যালয়ের তৎকালীন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, ব্যাংকের সাবেক শীর্ষ নির্বাহী, ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং পরিচালনা পর্ষদের একাধিক সদস্য রয়েছেন।
এ ছাড়া কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির নামও এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাদের হিসাবে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ রয়েছে।
আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ব্লুম সাকসেস ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ জালাল খান মজলিশ ও পরিচালক খাদিজা আক্তার; ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও দিলকুশা শাখা ব্যবস্থাপক মো হাবিবুর রহমান; সাবেক ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও ব্যবস্থাপক (অবসরপ্রাপ্ত) আরীফ মো শহীদুল হক; সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক চৌধুরী মোসতাক আহমেদ (ওরফে সি এম আহমেদ); সাবেক অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ ওয়াদুদ; সাবেক অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কোম্পানি সেক্রেটারি এ এস এম বুলবুল; সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও বিভাগীয় প্রধান (সিআরএম-১) আবু রাশেদ নওয়াব।
ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক ও বর্তমান পরিচালকদের মধ্যে আসামির তালিকায় আরও রয়েছেন মোয়াজ্জেম হোসেন, খলিলুর রহমান ও মাবরুর হোসেন।
এ ছাড়া মামলার আসামিদের তালিকায় রয়েছেন ক্রিস্টাল কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালাহ উদ্দীন খান মজলিশ ও পরিচালক আব্দুর রউফ; বেঙ্গল ও এম সার্ভিসেসের মালিক জন হক সিকদার; মেসার্স মাহবুব এন্টারপ্রাইজের মালিক সৈয়দ মাহবুব-ই-করিম; সিকোটেক হোল্ডিংস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো মাহফুজুর রহমান ও পরিচালক মো শফিকুল ইসলাম; টেক ইন্টেলিজেন্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো জামিল হুসাইন মজুমদার; এম এস কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপার্সের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ সালাহ উদ্দীন; জুপিটার বিজনেস শিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মমতাজুর রহমান এবং জুপিটার বিজনেস লিমিটেডের পরিচালক মোসফেকুর রহমান ও কৌশিক কান্তি।
আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারার পাশাপাশি ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে অভিযোগ আনা হয়েছে।


