অনুমোদন ছাড়াই হচ্ছে রাসায়নিক গুদাম

অনুমোদন ছাড়াই হচ্ছে রাসায়নিক গুদাম
অনুমোদনহীন রাসায়নিক কারখানার গুদামে বাড়ছে দুর্ঘটনা। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
Advertisement
Advertisement

অনুমোদনহীন রাসায়নিক কারখানার গুদামে একের পর এক বিস্ফোরণ-অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি ঘটলেও প্রতিকার মিলছে না। চারটি কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের বিধান থাকলেও তা অগ্রাহ্য করে যত্রতত্র গুদাম ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। পুরান ঢাকার অলিগলিতে থাকা গুদাম ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানীসহ সারাদেশে, ঘটছে অগ্নিদুর্ঘটনা। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে মারা যাচ্ছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।

বিস্ফোরক পরিদপ্তরের পরিদর্শক আসাদুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেছেন, মিরপুর শিয়ালবাড়ির গুদামটি অনুমোদনহীন। অনুমোদনের বাইরে এমন শত শত গুদাম রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একস্থানের লাইসেন্স নিয়ে অন্যস্থানে রাসায়নিক পদার্থ রাখা হচ্ছে, যা অবৈধ। পুরান ঢাকায় অভিযানের কারণে বিভিন্নস্থানে গুদাম সরানো হয়েছে। এখনো অভিযান চালানো হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

বিস্ফোরক পরিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, রাসায়নিক গুদামে অগ্নিকাণ্ডের অন্যতম কারণ হচ্ছে- দাহ্য রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি, অনুপযুক্ত মজুতকরণ এবং ত্রুটিপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। গুদামে মজুত থাকা বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক যেমন- ব্লিচিং পাউডার, প্লাস্টিক, হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ইত্যাদিতে সহজেই আগুন ধরতে পারে। এছাড়া, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট বা অন্য কোনো ত্রুটির কারণেও অগ্নিকাণ্ড ঘটে থাকে। কারো তদারকি না থাকায় দুর্ঘটনা বেড়েই চলছে।

২০১০ সালের ৩ জুন রাতে পুরান ঢাকার নিমতলীতে রাসায়নিকের গুদাম থেকে ছড়ানো আগুনে ১২৪ জনের মৃত্যু হয়। এর ৯ বছর পর ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের চুড়িহাট্টায় রাসায়নিক গুদামে আগুনে প্রাণ হারান ৭১ জন। গত ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকার পাশে টঙ্গিতে অগ্নিকাণ্ডে ফায়ার সার্ভিসের ৩ কর্মীসহ চারজন মারা গেছে। ২০২২ সালের ৪ জুন চট্রগ্রামের সীতাকুণ্ডে এমন অগ্নিকাণ্ডে অর্ধশতাধিক মারা যায়। চট্টগ্রাম সদরঘাটে রাসায়নিক গুদামেও অগ্নিকাণ্ড ঘটে। মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকার মিরপুর রূপনগর শিয়ালবাড়িতে গুদাম থেকে সৃষ্ট আগুনে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

মিরপুরে রাতেও চলে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ। ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/টাইমস

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবঃ) আলী আহমদ খান বলেছেন, রাসায়নিক গুদাম করতে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়ে সিটি কর্পোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স পেলে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স এবং বিস্ফোরক পরিদপ্তর নিরীক্ষা করে অনুমোদন দেয়। কারো অনুমোদন ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ এসব গুদাম করা হচ্ছে, নেই সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়।

আরও পড়ুন

তিনি বলেন, আগে পুরান ঢাকায় এসব গুদাম থাকলেও কয়েকটি দুর্ঘটনার পর তা সারাদেশে ছড়িয়ে গেছে। সিটি কর্পোরেশনের পরিদর্শক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরও এজন্য দায় রয়েছে। ঘটনা ঘটলেই হৈ চৈ পড়ে, পরে সব ধামাচাপা পড়ে যায়। আবার দুর্ঘটনা ঘটে।

নিমতলীর ভয়াবহতার পর পুরান ঢাকায় ৮শর বেশি অবৈধ রাসায়নিক গুদাম এবং কারখানা চিহ্নিত করে সেগুলো কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু তা বাস্তবায়ন হয়নি। এখনো পুরান ঢাকায় অনেক গুদাম রয়েছে।

মিরপুরে আগুন। ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/টাইমস

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, শিয়ালবাড়ির গুদামের অনুমোদন পাওয়া যায়নি। এমন আরো গুদাম থাকতে পারে। যারা গুদামের জন্য ঘর ভাড়া দেন তাদের উচিত লাইসেন্স ও ছাড়পত্র দেখে ভাড়া দেওয়া।

এদিকে, আগুন নেভাতে গিয়ে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ৪৯ জন কর্মী নিহত হয়েছেন। গত দশ বছরে নিহত হয়েছেন ২৪ জন। আর আহত হয়েছেন ৩৮৬ সদস্য। নিহত-আহত ফায়ার ফাইটারদের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে কাজ করতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে। অধিকাংশ মৃত্যু হয়েছে কেমিক্যাল কারখানার আগুন নেভাতে গিয়ে। কেমিক্যালের আগুন বুঝে ওঠার আগেই প্রাণ হারাতে হয়েছে এসব ফায়ার ফাইটারদের।

সবচেয়ে বেশি ১৩ জন ফায়ার ফাইটারের মৃত্যু হয় ২০২২ সালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঘটনায়। গত ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকার টঙ্গীতে একটি রাসায়নিকের গুদামে লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের চার কর্মী দগ্ধ হন। তাদের মধ্যে তিনজন মারা যান।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad