রাজধানী উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভবনে এফটি-৭ বিজিআই যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার দৃশ্য দেখে এখনো স্বাভাবিক হতে পারছেন না বেঁচে ফেরা শিক্ষার্থীরা। দুর্ঘটনার বীভৎসতায় ট্রমায় বাকরুদ্ধ, স্তদ্ধ তারা। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া কোমলমতি শিক্ষার্থীদের চোখে মুখে আতঙ্ক। কালো ধোঁয়া, আগুন আর বীভৎস পোড়া লাশ দেখে তারা যেন স্বাভাবিক হতে পারছেন না। সোমবার বিকালে সেনাবাহিনী ও উদ্ধারকর্মীদের সহায়তায় ঘটনাস্থল থেকে বের হয়ে স্বজনদেও বুকে মাথা রেখে কেঁদে ওঠে তারা।
অনেক শিক্ষার্থী, অভিবাবক ও ঘটনাস্থলে থাকা প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে টাইমস অব বাংলাদেশের কথা হয়। তারা ভয়াবহ ঘটনার বর্ণনা করেন।
স্কুৃলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মালিহা বলেন, ‘ক্লাশ শেষ করে বের হয়ে কালো ধোঁয়া দেখেই দৌড় দিই। এরপর পুরো মুখ কালো ধোঁয়ায় মেখে যায়। চোখ খুলে দেখি সামনে আগুন জ্বলছে।’ ৫ সেকেন্ডের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছেন বলে জানায় সে।
মালিহার সঙ্গে ক্যাম্পাস থেকে বের হওয়া ৭ম শ্রেণির ছাত্রী আলিফা তোবা জানায়, ‘প্লেনটি মাঠে পড়ে সরাসরি স্কুল রুমে ঢুকে যায়। শব্দে কান বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে সেখানে। কীভাবে প্রাণে বেঁচেছি তা আল্লাহ জানেন।’
এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের মিফতা আলম কলেজ হোষ্টেলে থাকেন। তিনি জানান, ‘ক্লাশ শেষে মাঠে পা ফেলতে যাবেন তখনই বিকট শব্দে বিমানটি মাঠে পড়ে একটি ভবনের নিচতলায় ঢুকে পড়ে। এরপরই চোখের সামনে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখেন অনেক ছেলে-মেয়েকে। অনেকের দেহ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
মিফতার মা মাহাবুবা আক্তার বসুন্ধরার বাসা থেকে ছুটে আসেন কলেজ ক্যাম্পাসের সামনে। চেষ্টা করেও ঘটনাস্থলে যেতে পরেননি। ছেলে বেঁচে থাকার খবর পান মোবাইল ফোনে। বিকাল চারটার দিকে ছেলেকে কাছে পেয়ে ‘শুকরিয়া’ জানান তিনি।
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রিয়ম জানায়, বিকট শব্দে কান স্তদ্ধ হয়ে যায়। কালো ধোঁয়ায় কিছু দেখা যাচ্ছিল না। তখন অসহায়ের মতো ছুটোছুটি শুরু করে সবাই। স্কুলের ড্রেস পড়া ছেলে-মেয়েদের ভবনের সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখে হতভম্ব হয়ে যায় সে।
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইব্রাহীম হক জানায়, বিমানটি যখন ধসে পড়ে তখনকার দৃশ্য বর্ণনা করার মতো না। কালো ধোঁয়া ও বিকট শব্দের সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে যায়। সবাই পাগলের মতো ছুটতে শুরু করে। নিরাপদ স্থান কোনটি তা কেউ বলতে পারেনি। শিক্ষার্থী, শিক্ষক-শিক্ষিকা সবাই জীবন বাঁচাতে ছুটেছেন। ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা সেখানে গিয়ে উদ্ধার কাজ শুরু করলে বেঁচে থাকা প্রাণের আওয়াজ শোনা যায়। বাঁচার আকুতি করেন জানান আহতরা।

স্কুল ক্যাম্পাসে বিমান দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দুপুরে ছুটে আসা শামীমা হক বিকাল পৌনে চারটার দিকে ছেলে ইব্রাহীম হককে ফিরে পান। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তাদের বাসা উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরে ৭/সি সড়কে।
নবম শ্রেণির ছাত্র ছোঁয়া স্কুল হোস্টেলে থাকে। সে জানায়, দুর্ঘটনার সময় তিনি মাঠের এক কোনে ছিলেন। ধোঁয়া, বিকট শব্দ ও আগুনের তীব্রতায় তিনি দৌড়ে ছোটেন হোস্টেলের দিকে। অনেকেই তখন ছোটে। কেউ কারো দিকে তাকানোর ফুসরত ছিল না। তার ফুপু উর্মি আক্তার বিকালে এসে তাকে নিয়ে যান।
এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হ্যাপী আক্তার বলেন, ‘ক্লাশ শেষে বের হব, তখনই বিকট শব্দ’। তিনি থাকের ক্যাম্পাসের বাইরে এক হোস্টেলে। গ্রামের বাড়ি গাজীপুরের শ্রীপুর ভুতুলিয়ায়। দুর্ঘটনার পর সেনা সদস্যরা উদ্ধার করে তাকে হোস্টেলে পৌঁছে দেন।
এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের আরেক শিক্ষার্থী রাফি জানান, এমন শব্দ আর পরিস্থিতি কোনো সিনেমাতেও হয় না। কলেজ ছুটির পর যারা হোস্টেলে থাকে তারা সেদিকে যাবে-অন্যরা বের হবে বাসার উদ্দেশে। ঠিক তখনই বিমানটি দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে। এরপরই আর্তনাদ- আহাজারী, বাঁচার আকুতি। কে কাকে বাঁচাবে-সবাই নিজেকে বাঁচানোর পথ খুঁজছে তখন। ধোঁয়া, আগুন-ফুয়েলের গন্ধে বিষিয়ে ওঠে পরিবেশ।
রাফির মা কাকলি বেগম ছেলেকে কাছে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ‘আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করি।’
এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের সোহরাব হোসেনের অভিবাবক শারমিন সুমি জানান, স্কুল ছুটি হয়ে গিয়েছিল। এরপর চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ের জন্য ক্লাশে থাকতে বলা হয়। হায়দার আলী ভবনের সামনে মাঠে পড়া বিমানটি সরাসরি ওই কক্ষে ঢুকে যায় বিকট শব্দে। ভবনটি দুমড়ে-মুচড়ে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। তার দাবি, চতুর্থ শ্রেণির কোনো ছেলে-মেয়ে বেঁচে নেই। মারা গেছেন ওই ক্লাশের শিক্ষক-শিক্ষিকাও।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আরিয়ানের (১১) সারা শরীর এমনকি মাথার চুল পর্যন্ত পুড়ে গেছে। তার মা শরিফা বেগম বারবার মুর্ছা যাচ্ছেন। বিলাপ করছেন। কোনো শান্তনার বাণীই তার কানে যাচ্ছে না। শরিফা বেগম বলেন, ‘স্কুলে বিমান পড়ার খবর পেয়ে মনটা ছটফট করে ওঠে। স্কুলের সামনে গেলে জানতে পারি ছেলেকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। আমার বুকের মানিক কেমন করে পুড়লো বলেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।’
সপ্তম শ্রেণির নিমিষা তাওসীন (১৪) জানান, ৩ ভাই এক বোনের মধ্যে সে তৃতীয়। বাসা উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরে। তাওসীন জানান, আগুন ও ধোঁয়ায় তখনকার পরিবেশ পরিস্থিতি কী ছিল তা বলে বোঝানো যাবে না। আল্লাহ নিজ হাতে ছেলেকে বাঁচিয়েছেন বলে জানান তার মা রুমা আক্তার।
দিয়াবাড়িতে ঘটনাস্থলের পাশে মেট্রোরেলের অফিস। সেখানে কর্তব্যরত আনসার সদস্য জহিরুল ইসলাম জানান, দুপুর একটার দিকে কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে বিমানটি স্কুল মাঠে নেমে পড়ে। এরপর বিকট শব্দ হয়। তার দাবি, উদ্ধারকাজ শুরু হলে ৮টি লাশ তিনি বের করতে দেখেন। সবগুলো আগুনে পুড়া দেহ ছিল।
আরেক আনসার সদস্য জামাল হোসেন জানান, কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে বিমানটি কাত হয়ে পড়েছে। বিকট শব্দ হয়। এরপর সেখানে গিয়ে ছিন্নভিন্ন দেহ পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। আহতদের উদ্ধার কাজে হাত দেন তিনি।
বিনিময় পরিবহনের বাসচালক মোজাফ্ফর জানান, তিনি বিআররটিএ অফিসে কাজে এসে দুর্ঘটনার পরই সেখানে যান। স্কুল মাঠে পর পর তিনটি হেলিকপ্টার নামে। দুটি সেনাবাহিনীর। অন্যটি আরেক বাহিনীর। হেলিকপ্টারে একের পর এক মরদেহ তুলে নিতে দেখেন তিনি। মোজাফ্ফর বলেন, ‘লাশ পোড়া গন্ধ ও বিমানের তেলের গন্ধ মিলে বিশ্রি পরিবেশ তৈরি হয়।’
ফায়ার সার্ভিসের সদস্য শুভ জানান, তিনি নিজে ৮টি মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দিয়েছেন। পোড়া লাশ তোলা অনেক কষ্ট বলেও জানান তিনি।


