যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কার্যালয় হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসকে ‘জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ’ (ন্যাশনাল মনুমেন্ট) ঘোষণা করে নির্বাহী আদেশে সই করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দাবি, এই আদেশের মাধ্যমে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে ‘নির্দিষ্ট কিছু’ পরিবর্তন আনতে পারবেন না।
বিবিসির খবরে বলা হয়, ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দাপ্তরিক কার্যালয় ওভাল অফিসের বাহ্যিক চেহারায় বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো- কক্ষটির দেয়ালে বিপুল পরিমাণ সোনালি সাজসজ্জা যুক্ত করা।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা এটিকে জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে ঘোষণা করছি। ফলে কোনো ব্যক্তি এটিকে স্পর্শ করতে, ধ্বংস করতে কিংবা ভেঙে ফেলতে পারবেন না। নির্বোধ কিছু মানুষ সামান্য ভিন্ন আকৃতির কিছু নির্মাণের জন্য এটি ভেঙে ফেলুক, তা আমরা হতে দেব না।’
বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের হোয়াইট হাউসে সামান্য কিছু পরিবর্তন আনার ক্ষমতা রয়েছে। তবে বড় ধরনের নির্মাণ বা সংস্কার প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কংগ্রেসের অনুমতি প্রয়োজন।
বৃহস্পতিবার সই করা নির্বাহী আদেশে ওভাল অফিসের পাশাপাশি এর আশপাশের কয়েকটি কক্ষকেও জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে আদেশের নথিতে বলা হয়েছে, এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের মনমতো সাজসজ্জা পরিবর্তন, আসবাবপত্র নির্বাচন কিংবা দৈনন্দিন কার্যক্রম ও নিরাপত্তার প্রয়োজনে সাধারণ পরিবর্তন আনার ক্ষমতা সীমিত হবে না। তবে এসব পরিবর্তনের ফলে স্মৃতিস্তম্ভটির ঐতিহাসিক কাঠামো বা স্থাপত্যগত বৈশিষ্ট্যের কোনো উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করা যাবে না।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা ওভাল অফিসকে পছন্দ করি। হোয়াইট হাউসের মতো এটিও একটি প্রতীক। এটি আমাদের দেশ এবং দেশের মহানতার প্রতীক।’

মার্কিন প্রেসিডেন্টের জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ ঘোষণা করার ক্ষমতা রয়েছে। এ ধরনের স্মৃতিস্তম্ভের মর্যাদা দেশটির জাতীয় উদ্যানের মর্যাদা সুরক্ষিত রাখার কাছাকাছি।
ট্রাম্পের আদেশে ওভাল অফিসের ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য, স্থাপত্যগত অখণ্ডতা এবং প্রেসিডেন্টের কার্যালয় হিসেবে এর ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব জাতীয় উদ্যান পরিষদকে দেওয়া হয়েছে।
পুরো হোয়াইট হাউস ভবনটি অনেক আগে থেকেই জাতীয় ঐতিহাসিক স্থাপনার স্বীকৃতি পেয়েছে। ভবনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব রক্ষা এবং আকস্মিক পরিবর্তন ঠেকানোই এ স্বীকৃতির উদ্দেশ্য।
ট্রাম্পের ঘোষণায় বিদ্যমান এই সুরক্ষার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এতে বলা হয়েছে, ‘এটি সত্ত্বেও ওভাল অফিস একটি স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে বিশেষ স্বীকৃতি এবং সুরক্ষামূলক ব্যবস্থাপনার দাবি রাখে, কারণ জাতীয় পর্যায়ে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে।’
জাতীয় ঐতিহাসিক সংরক্ষণ আইন থেকে কংগ্রেস প্রেসিডেন্টদের জন্য একটি বিশেষ ছাড় রেখেছে, যেখানে তারা প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে পারেন। বর্তমান ওভাল অফিসের নকশা করা হয়েছিল ১৯৩০-এর দশকের গোড়ার দিকে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের উদ্যোগে এর বর্তমান কাঠামো গড়ে ওঠে।
ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণে বিশেষজ্ঞ আইনজীবী প্রতিষ্ঠান কালচারাল হেরিটেজ পার্টনার্সের গ্রেগ ওয়ার্কহেইজার বিবিসিকে বলেন, আসবাবপত্র ও সাজসজ্জার মতো অস্থায়ী পরিবর্তন সম্পূর্ণভাবে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে।
‘যতক্ষণ পর্যন্ত স্থায়ী শিল্পকর্ম ও স্থাপত্যের ক্ষতি করা হচ্ছে না, ততক্ষণ প্রেসিডেন্ট সাধারণত নিজের ইচ্ছামতো পরিবর্তন আনতে পারেন’, যোগ করেন তিনি।
ওয়ার্কহেইজারের অভিযোগ, ওয়াশিংটনের অন্য ঐতিহাসিক স্থাপনার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন চরম অবহেলা দেখিয়েছে। পাশাপাশি ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণে বাধ্যবাধকতা দিয়ে করা আইনগুলোও তার প্রশাসন দুর্বল করার চেষ্টা করেছে। এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে মামলাও হয়েছে।

ওয়াশিংটনজুড়ে সৌন্দর্যবর্ধনের নামে বড় ধরনের সংস্কার ও নির্মাণকাজ চালাচ্ছেন ট্রাম্প। গত এক সপ্তাহে এসব নির্মাণকাজের প্রচার করতে তিনি তিনটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। এর মধ্যেই মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার রিপাবলিকান দল ডেমোক্র্যাটদের কাছে বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে।
ওয়ার্কহেইজার বলেন, ‘এখানেই তার ভণ্ডামি। একদিকে তিনি ওভাল অফিস সংরক্ষণের গুরুত্বের কথা বলছেন, যদিও আইনগতভাবে এ ধরনের ঘোষণা কার্যকর করার ক্ষমতা তার নেই। অন্যদিকে, অন্য ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের সুযোগ করে দেওয়া আইনটিকেই তিনি পুরোপুরি দুর্বল করে দিচ্ছেন।’
ট্রাম্পের বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে ওয়ার্কহেইজার বলেন, ওয়াশিংটন ডিসিতে কেনেডি সেন্টার সংস্কার, রাজধানীতে একটি বিজয়স্তম্ভ নির্মাণ এবং ঐতিহাসিক নির্বাহী দপ্তর ভবনের গ্রানাইট পাথরের বাইরের অংশে রং করার উদ্যোগ নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট। এরমধ্যে দুটি প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখার আবেদন জানিয়ে এরইমধ্যে মামলা করেছে ওয়ার্কহেইজারের প্রতিষ্ঠান।
গত অক্টোবর মাসে টাইম সাময়িকীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সিক্রেট সার্ভিসের উদ্বেগের কারণে ওভাল অফিস ভেঙে ফেলতে হতে পারে। সে সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমি বলেছিলাম, আমার কথা হলো- নতুন একটি ভবন তৈরি করা যাবে না কেন? এটি একটি বিশেষ জায়গা।’
মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচার চলাকালে ট্রাম্পের নেওয়া এসব নকশা ও সাজসজ্জার পরিবর্তনের সমালোচনা করেন ডেমোক্র্যাটরা। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও তার সোনালি সাজসজ্জার পরিবর্তন নিয়ে ব্যঙ্গ করেন। তিনি বলেন, ট্রাম্পের এসব পরিবর্তনের ফলে হোয়াইট হাউসের চেহারা এমন হয়েছে, যেন ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন সেখানে চিজকেক ফ্যাক্টরির (পনির দিয়ে তৈরি কেক) একটি শাখা খুলেছেন।


