মগবাজার থেকে গাবতলীর দূরত্ব প্রায় সাড়ে ৯ কিলোমিটার। সরকার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী এই পথের বাসভাড়া হওয়ার কথা ২৫ টাকা। কিন্তু ‘এমএম লাভলী’ ও ‘লাব্বাইক পরিবহন’ যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করছে ৪০ টাকা–যা মূলত ১৫ কিলোমিটার পথের ভাড়া।
একইভাবে শাহবাগ থেকে মেরুল বাড্ডার দূরত্ব ৯ কিলোমিটারের কিছু বেশি, আর নির্ধারিত ভাড়া ২৪ টাকা। অথচ ‘রমজান পরিবহন’ আদায় করছে ৩০ টাকা। এ নিয়ে বাসের সহকারী ও জারিফ হোসেন নামের এক যাত্রীর মধ্যে তুমুল তর্কাতর্কি হতে দেখা যায়।
জারিফ ভাড়ার তালিকা দেখতে চাইলে জানা যায়, গাড়িতে কোনো তালিকা টাঙানো নেই। বাসের কন্ডাক্টর তাকে জানিয়ে দেন, সবাই একই হারে ভাড়া দিচ্ছে এবং তাকেও সেটাই দিতে হবে।
শহরের ভেতরের রুট হোক কিংবা দূরপাল্লার পথ, যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নেওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে সাম্প্রতিক জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সুযোগ নিয়ে পরিবহন কোম্পানিগুলো অনিয়মতান্ত্রিকভাবে আরও বেশি টাকা আদায় করছে।
আগে তেলের দাম বাড়লে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকাতে রাস্তায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে অভিযান চালাত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। তবে এবার তারা শুধু ভাড়ার একটি নতুন তালিকা তৈরি করে পরিবহন মালিকদের হাতে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে।
বিআরটিএ কিলোমিটার মেপে ভাড়া ঠিক করলেও পরিবহন কোম্পানিগুলো ‘ওয়েবিল’ নামের নিজেদের তৈরি এক পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট পয়েন্টের হিসাব ধরে টাকা আদায় করে। এই নিয়মে বাসের যাত্রী নির্দিষ্ট এলাকা পার হলেই তিনি মাঝপথে যেখানেই নামুন না কেন পরবর্তী পুরো অংশের ভাড়া দিতে বাধ্য হন।
যেমন, লাভলী পরিবহনে মগবাজার থেকে আসাদ গেটগামী এক যাত্রীর সঠিক ভাড়া ১৫ টাকা হলেও তার কাছ থেকে নেওয়া হয় ২৫ টাকা। ওয়েবিল পদ্ধতির কারণে এই যাত্রাপথে দুটি জায়গায় খাতায় সই নেওয়া হয় এবং দুই ধাপে ১০ টাকা ও ১৫ টাকা করে মোট ২৫ টাকা ভাড়া ধরা হয়।
সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী, বাসের ভেতর সহজে দেখা যায় এমন জায়গায় ভাড়ার তালিকা না টাঙিয়ে যাত্রী পরিবহন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তা সত্ত্বেও পরিবহন কোম্পানিগুলো ভাড়ার তালিকা খুলে রাখে, কারণ তালিকা টাঙানো থাকলে বাড়তি টাকা আদায় করা সম্ভব হয় না। কোনো বাসে তালিকা টাঙানো হলেও পরে তা ছিঁড়ে ফেলা হয়। এমনকি সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনের (বিআরটিসি) বাসেও একই চিত্র দেখা গেছে।
মিরপুর ১২ থেকে সদরঘাট রুটের ‘বিহঙ্গ পরিবহনের’ যাত্রী আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘কোনো হিসাব ছাড়া তারা মনমতো ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি দাবি করে। ভাড়ার তালিকা দেখতে চাইলে নানা অজুহাত দেয় কিংবা ঝগড়া শুরু করে।’
‘আজমেরী গ্লোরী পরিবহনে’ ভাড়ার তালিকা না থাকার কারণ জানতে চাইলে কন্ডাক্টর মোহাম্মদ সুমন মিয়া দাবি করেন, ‘যাত্রীরা নিজেরাই ভাড়ার কাগজ টেনে ছিঁড়ে ফেলে। বারবার নতুন তালিকা লাগালেও তা টিকিয়ে রাখা যায় না।’
তবে ‘দিশারী পরিবহনের’ কন্ডাক্টর মোহাম্মদ রুবেল শোনালেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, ‘মালিক সমিতি যে ভাড়া ঠিক করে দেয়, আমরা সেই ভাড়া-ই তুলি।’
সড়ক সুরক্ষাবিষয়ক সংস্থা ‘রোড সেফটি ফাউন্ডেশন’-এর নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান টাইমসকে বলেন, ‘প্রতিটি বাসের নাম ও নম্বর উল্লেখ করে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা যদি বাসের ভেতর স্পষ্ট জায়গায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয়, তবে সাধারণ যাত্রীরা কর্তৃপক্ষের কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ করার সুযোগ পাবেন।’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সাইফুল আলম অবশ্য দাবি করেন, যাত্রীরা এমনিতেই ভাড়ার হার জানেন, তাই তালিকা টাঙানোর বিশেষ প্রয়োজন হয় না। তবে বাসে ভাড়ার তালিকা টাঙানোর আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন।
বাড়তি ভাড়ার বিষয়ে সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগ জানানোর সুযোগও খুব কম। বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে না থাকলে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়কারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায় না, আর পুলিশও একা কিছু করতে পারে না। যদিও বিআরটিএর হেল্পলাইন ও ওয়েবসাইট রয়েছে, কিন্তু খুব কম যাত্রীই সেখানে অভিযোগ জানান। আবার অভিযোগ করলেও উপযুক্ত প্রমাণ থাকে না, কারণ ভাড়া নেওয়ার পর কোনো টিকিট দেওয়া হয় না।
পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজার থেকে সাভার পর্যন্ত ‘সাভার পরিবহনের’ বাসের দূরত্ব প্রায় ২৮ কিলোমিটার। তেলের দাম বাড়ার পর এই রুটের ভাড়া ৭৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯০ টাকা করা হয়েছে। অথচ কিলোমিটার প্রতি নির্ধারিত আড়াই টাকার হিসাব অনুযায়ী বাসের ভাড়া হওয়ার কথা ৭৩ টাকা। অর্থাৎ, তেলের দাম বাড়ার আগেই যাত্রীরা নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি দিতেন, আর এখন তাদের ওপর আরও ১৫ টাকার বাড়তি বোঝা চাপানো হয়েছে।
বাসচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের তো কিছু করার নেই। মালিকরা যেভাবে নির্দেশ দেন, আমরা সেভাবেই ভাড়া তুলি।’
মনগড়া এই ভাড়া নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জুনায়েদ শেখ বলেন, ‘আগে সাভার রুটে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ২৫ থেকে ৩০ টাকা নেওয়া হতো। এখন চাওয়া হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা।’
পুরো পরিস্থিতি নিয়ে বিআরটিএ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান চিরাচরিত কায়দায় বলেন, যদি সরকার নির্ধারিত ভাড়ার নিয়ম না মানলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দূরপাল্লার বাসেও স্বেচ্ছাচারিতা
দূরপাল্লার রুটগুলোতেও একইভাবে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। গুলিস্তান থেকে খুলনা জিরো পয়েন্টের দূরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটার। এই রুটে ‘টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস’ সাধারণ বাসে ভাড়া নিচ্ছে ৭৪০ টাকা। বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী এই ভাড়া হওয়া উচিত ৬১২ টাকা। এর সঙ্গে এক্সপ্রেসওয়ে ও পদ্মা সেতুর টোল বাবদ ৭০ টাকা যোগ করলেও মোট ভাড়া দাঁড়ায় ৬৮৫ টাকা।
৫১ সিটের এসব বাসের জন্য দূরপাল্লার নির্ধারিত ভাড়া কিলোমিটারে ২ টাকা ৪০ পয়সা। যাত্রীদের একটু আরামে বসাতে আসন সংখ্যা কমানো হলে কোম্পানিগুলো আনুপাতিক হারে ভাড়া সামান্য বাড়াতে পারে। কিন্তু বাসগুলোতে ৪৪ থেকে ৪৭টি সিট থাকা সত্ত্বেও তারা ৪০ সিটের হিসাব ধরে বেশি ভাড়া আদায় করছে।
এমনকি ৪০ সিটের হিসাব ধরলেও প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া হওয়ার কথা ৩ টাকা ৬ পয়সা। ৪৪ সিটের বাসে এটি ২ টাকা ৮০ পয়সা এবং ৪৭ সিটের বাসে ২ টাকা ৬০ পয়সার বেশি হওয়া উচিত নয়।
ঢাকার গুলিস্তান থেকে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ বাস টার্মিনালের দূরত্ব প্রায় ১৯৬ কিলোমিটার। এই রুটে ‘গোল্ডেন লাইন পরিবহন’ সাধারণ বাসে ভাড়া নিচ্ছে ৮৫০ টাকা। অথচ টোলসহ ৪০ সিটের বাসের ভাড়াও কোনোভাবেই ৬৭০ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়।
ভাড়া বেশি আদায়ের আরেকটি কৌশল হলো পথের দূরত্ব বাড়িয়ে দেখানো। ঢাকার মহাখালী থেকে কিশোরগঞ্জের কাপাসিয়ার মূল দূরত্ব ১০৬ কিলোমিটার হলেও যাত্রীদের কাছ থেকে ১৩৫ কিলোমিটারের হিসাব ধরে ভাড়া নেওয়া হয়। প্রায় প্রতিটি দূরপাল্লার পথেই অতিরিক্ত টাকা আদায়ের জন্য ১০ থেকে ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্ব বাড়িয়ে দেখানো হচ্ছে।
উল্লেখ্য, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর গত ২৪ সেপ্টেম্বর বাসভাড়া নতুন করে ঠিক করা হয়। নতুন হার অনুযায়ী শহরের ভেতরে মিনিবাসের জন্য কিলোমিটারে ২ টাকা ৬০ পয়সা, বড় বাসের জন্য ২ টাকা ৭০ পয়সা এবং দূরপাল্লার ৫১ সিটের বাসের জন্য ২ টাকা ৪০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। এতে আগের চেয়ে প্রায় ১৭ শতাংশ ভাড়া বাড়ার কথা থাকলেও বাস্তবে যাত্রীদের ওপর দ্বিগুণ বা তারচেয়েও বেশি ভাড়ার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ভাড়া বাড়ানোর ঠিক আগেই ২১ ও ২২ সেপ্টেম্বর সড়ক পরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সতর্ক করে বলেছিলেন, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে বাসের রুট পারমিট বাতিল করা হতে পারে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এমন হুঁশিয়ারি আগেও বহুবার দেওয়া হয়েছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে কোনো কার্যকারিতা দেখা যায়নি।


