তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের প্রতিনিধি হিসেবে রাজধানী ঢাকায় যেসব সংগঠনের নেতারা কথা বলেন বা সরকারের সঙ্গে দেন-দরবারে অংশ নেন, শ্রমিকদের ওপর তাদের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আন্দোলন শুরু বা বন্ধে তাদের ঘোষণা বা নির্দেশনার প্রতিফলন না ঘটায় এসব সংগঠন মূলত কী উদ্দেশ্যে কারা পরিচালনা করছেন, তা নিয়ে বছরের পর বছর ধরেই চলে আলোচনা।
এবার নূন্যতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাকশ্রমিকরা ঢাকার মিরপুরের পাশাপাশি সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখাচ্ছে।
এরই মধ্যে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের পাশাপাশি সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস কারখানা মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের বেশ কয়েকজন প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে শ্রমিক প্রতিনিধিরা আন্দোলন বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিলেও পরিস্থিতি শান্ত হচ্ছে না।
বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের নিয়ে গবেষণা করা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক মো. ইসমাইল হোসেন টাইমসকে বলেন, ‘আমাদের দেশের যে শ্রমিক সংগঠনগুলো আছে এগুলো আসলে শ্রমিকদের জন্য হয়ে উঠতে পারেনি। এদের অধিকাংশই কারও না কারও দ্বারা প্রভাবিত। কেউ সরকারের হয়ে কাজ করে, কেউ মালিকপক্ষের হয়ে কাজ করে কিংবা অন্য কোনো পক্ষের। ফলে সাধারণ শ্রমিকদের এদের ওপর যে আস্থা সেই আস্থাটা তৈরি হয়নি। যার কারণে আমরা দেখতে পাই যখন আন্দোলন শুরু হয় তখন এরা অনেক অনুরোধ করলেও সাধারণ শ্রমিকরা এদের অনুরোধে সাড়া দেয় না।’
গত সোমবার সচিবালয়ে শ্রমিক সংগঠনের ৩৮ জন প্রতিনিধি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এর আগে বিকেএমইএ এবং বিজিএমইএ’র প্রতিনিধি মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে কারখানায় নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানান।
মঙ্গলবার শিমুল বিশ্বাসও আহছানিয়া মিশনে বেশ কয়েকটি সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকের পরেও সেখানে অংশ নেওয়া নেতারা শ্রমিকদেরকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে এর কোনো প্রতিফলনই নেই।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম টাইমসকে বলেন, ‘শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের সরকারের সঙ্গে বৈঠকের পরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে এসব সংগঠন বা নেতাদের সঙ্গে শ্রমিকদের যোগাযোগ বা তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই।’
তিনি বলেন, ‘সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এবং পোশাক খাতকে অশান্ত করতে এই আন্দোলনের পেছনে শ্রমিক সংগঠনের অনেকের ইন্ধনও রয়েছে।’
বিজিএমইএর সহসভাপতি মো. শিহাবউদ্দোজা চৌধুরী বলেন, ‘শ্রমিক সংগঠনের জ্যেষ্ঠ নেতারা বলেছেন কোনো আন্দোলন হবে না। কিন্তু তারপরও আন্দোলন হচ্ছে। সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আন্তরিক চেষ্টা করছে। এরপরও কারা আন্দোলনের নামে কারখানায় ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করছে তা তদন্তের দাবি রাখে।’
কারখানা পর্যায়ে শ্রমিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা কতটা রয়েছে তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন টেক্সটাইল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশন নামে একটি সংগঠনের সভাপতি আবুল হোসাইন।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘সরকার নতুন করে যে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে তা আরও কিছুদিন আগে করলে এই সমস্যাটা হতো না। বর্তমানে আন্দোলনে একটি তৃতীয় পক্ষের অনুপ্রবেশ ঘটেছে যারা এই আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। শ্রমিকরা কাজে ফিরতে আগ্রহী।’
অনুপ্রবেশকারী কারা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কারা সত্যিকারের শ্রমিক এবং কারা অনুপ্রবেশকারী তা চিহ্নিত করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। অনুপ্রবেশকারীদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব সরকারের।’
সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তারও সোমবারের বৈঠকে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘শ্রমিক সংগঠন অনেক রয়েছে। এসব সংগঠনের কেউ বিএনপির, আবার কেউ আওয়ামী লীগের। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ ও ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের মানুষ এসব সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। প্রত্যেক সংগঠন ও নেতা নিজ নিজ অবস্থান থেকে আন্দোলন করছে।’
এতগুলো সংগঠন ও ভিন্ন ভিন্ন মতের মানুষকে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করাও সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন নাজমা আক্তার। তিনি বলেন, ‘প্রত্যেকের বক্তব্য ও কর্মসূচি আলাদা। আমি সব সময় শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করার চেষ্টা করি।’
গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু বলেন, ‘আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষ রয়েছে বললেও সরকার তাদের নাম প্রকাশ করছে না। বর্তমান সরকারও আওয়ামী লীগ সরকারের মতো একইভাবে শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। এজন্য শ্রমিকরা দাবি আদায়ে রাস্তায় রয়েছে।’
বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতে শ্রমিকদের অধিকার ও দাবি আদায়ের জন্য ৫৪টি রেজিস্টার্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফেডারেশন (কেন্দ্রীয় সংগঠন) এবং এক হাজারেরও বেশি নিবন্ধিত বেসিক ট্রেড ইউনিয়ন রয়েছে।
এর মধ্যে জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন (এনজিডব্লিউএফ), বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র (জিডাব্লিওটিইউসি), বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশন (বিজিআইডাব্লিওএফ) সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন উল্লেখযোগ্য।


