হাম-ডেঙ্গুর মৃত্যু মেনেই চলতে হবে এখন?

হাম-ডেঙ্গুর মৃত্যু মেনেই চলতে হবে এখন?
হামে মারা যাওয়ার পর ঢাকার শিশু হাসপাতালে দাদির কোলে ১০ মাস বয়সী সুহা। তার শরীরে জড়ানো রয়েছে জোড়াতালি দেওয়া কাপড়। ছবি: জান্নাতুল ফেরদাউস/টাইমস
Advertisement
Advertisement

মুন্সিগঞ্জের নবম শ্রেণির ছাত্র আজাদ আট দিন ধরে ঢাকার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি। দুই মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে সে। দেড় মাস আগে একই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল তাকে। তখন সংক্রমণ হয়েছিল লিভারে। পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আগেই আবার জ্বর, এবার সংক্রমণ ছড়িয়েছে ফুসফুসে।

আজাদের বাড়ি পৌর এলাকায়। তার মা মোহনা বেগম বলেন, ‘পৌরসভা থেকে দিনে দুইবার ফগিং করে। আমরাও বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার রাখি, কোথাও পানি জমতে দিই না, তাও আমার ছেলেটা দুইবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলো। ওর বাবা সৌদি আরব থাকে, আমাকে একাই সবকিছু করতে হচ্ছে। খেয়ে না খেয়ে হাসপাতালে এই আট দিন।’

আজাদের অসুস্থতা কেবল একটি পরিবারের দুর্ভোগ নয়। ডেঙ্গু ও হাম নিয়ন্ত্রণে সরকারি কর্মসূচি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও টিকাদান চলছে। তারপরও হাসপাতালে রোগীর চাপ, মৃত্যু এবং সন্দেহজনক মৃত্যুর সংখ্যা কমছে না। এই দুই রোগের সঙ্গে লড়াই করতে করতে মৃত্যু যেন জনস্বাস্থ্যের নিয়মিত খবরে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু এই মৃত্যুগুলো কি অনিবার্য, নাকি প্রতিরোধ ও চিকিৎসাব্যবস্থার দুর্বলতা সেগুলোকে ঠেকানো কঠিন করে তুলছে, সেই প্রশ্নের জবাব মিলছে না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছর এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ১৫ হাজার ৬১৭ জন, মারা গেছেন ৩৫৭ জন। গত বছর ভর্তি রোগী ছিলেন ৬০ হাজার ৭৯১ জন, মৃত্যু হয়েছিল ২৪৯ জনের। অর্থাৎ, এক বছরে রোগী বেড়েছে প্রায় ৯০ শতাংশ, মৃত্যু বেড়েছে প্রায় ৪৩ শতাংশ।

হামের চিত্রও উদ্বেগজনক। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত উপসর্গ নিয়ে শনাক্ত হয়েছে ২ লাখ ১৪ হাজার ৫৫১ জন। পরীক্ষাগারে হাম নিশ্চিত হয়েছে ২৩ হাজার ১৫৭ জনের। একই সময়ে উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১ হাজার ৯৭ জন এবং নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ১০৪ জনের। অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর ডেঙ্গু ও হামে মোট মৃত্যু ১ হাজার ৫৬২।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে ১২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা ও মশা নিয়ন্ত্রণের বিশেষ কর্মসূচি উদ্বোধন করেন। হামের সংক্রমণ মোকাবিলায় ৫ এপ্রিল ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। পরে ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে দেশব্যাপী ক্যাচ-আপ টিকাদান কর্মসূচি চালু করা হয়, যা চলবে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত।

সরকারি হিসাবে, টিকাদানের মোট কাভারেজ ১১৭ দশমিক ২ শতাংশ অর্থাৎ, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি টিকা দেওয়া হয়েছে।

অবশ্য জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ মুশতাক হোসেনের মতে, এটি কোনো সাফল্য নয়। তিনি বলেন, ‘শিশু আছে ১০০, লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৫০, সেখানে ৬০ বা ৭০ জনকে টিকা দিলে তো লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি অর্জন হবেই।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক মো. হালিমুর রশিদ অবশ্য ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে আগের বছরের তুলনায় উন্নত বলে মনে করেন। তার মতে, সংক্রমণের হার বাড়লেও মৃত্যুহার কমেছে।

‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেই পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর বাইরে আর কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, তা তার জানা নেই’, বলেন তিনি।

হামের বিষয়ে হালিমুর বলেন, ‘জুন-জুলাই থেকে সংক্রমণ কমেছে এবং টিকাদান কর্মসূচি চলছে। আর চলতি মাসে নিশ্চিত হামে কোনো মৃত্যু হয়নি। সর্দি-জ্বরের পর শরীরে র‍্যাশ নিয়ে কোনো শিশু মারা গেলে অনেক ক্ষেত্রে সেটিকে হামজনিত মৃত্যু বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে।’

মুশতাক হোসেনের মতে, হাম মহামারির পর্যায়ে পৌঁছেছে, ডেঙ্গুও প্রায় সেই অবস্থায়। পরিস্থিতি বিবেচনায় দুটিকেই জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা উচিত।

আরও পড়ুন

তিনি মনে করেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা শুধু মশা নিধন বা টিকাদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসার সক্ষমতা এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘাটতি।

কমিউনিটি পর্যায়ে পর্যাপ্ত সেবা না থাকায় অনেক রোগীর অসুস্থতা সময়মতো শনাক্ত হচ্ছে না। জটিল অবস্থায় তাদের বড় হাসপাতালে আসতে হচ্ছে। এতে একদিকে মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে বড় হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।

ঢাকার বড় হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ শয্যার সংকট তীব্র, হাই-ফ্লো অক্সিজেনের ব্যবস্থাও সীমিত। রোগীরা মেঝেতে বিছানা করে সেবা নিচ্ছেন।

মুশতাক হোসেন বলেন, ‘দক্ষ জনবলের অভাবও গুরুতর রোগীদের চিকিৎসায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শুধু আইসিইউ বাড়ালেই হবে না; সেগুলো চালানোর মতো প্রশিক্ষিত জনবলও নিশ্চিত করতে হবে।’

স্বাস্থ্যসেবাকে পিরামিডের মতো সাজানোর ওপর জোর দেন এই বিশেষজ্ঞ। তার মতে, মাঠপর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ ও প্রাথমিক চিকিৎসা শক্তিশালী করতে হবে, বস্তি এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়াতে হবে এবং নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে যুক্ত করারও সুযোগ রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সময়মতো অভিযান না চালানোর বিষয়টিও তুলেছেন মুশতাক। তার মতে, মৌসুম শুরুর আগেই ঢাকায় চিরুনি অভিযানের কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু তখন সরকার সেটাতে কান দেয়নি। এখন সংক্রমণ সারা দেশে ছড়িয়েছে।

বিএনপি সরকার নির্বাচনি ইশতেহারে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও ম্যালেরিয়ার মতো প্রাণঘাতী মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে কেবল মৌসুমভিত্তিক নয়, বরং বছরব্যাপী বিজ্ঞান-ভিত্তিক মশা নিধন এবং সমন্বিত প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলেছিল।

ডেঙ্গু মোকাবিলায় মোট ২০টি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এখনো তা প্রস্তুতির পর্যায়েই রয়েছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

হালিমুর রশিদ বলেন, উলবাকিয়া পদ্ধতিতে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।

উলবাকিয়া এক ধরনের প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া। গবেষণাগারে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার শরীরে এই ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করিয়ে এমন মশা তৈরি করা হয়, যার ডেঙ্গু, জিকা বা চিকুনগুনিয়ার মতো ভাইরাস ছড়ানোর সক্ষমতা কমে যায়। এসব মশা পরিবেশে ছেড়ে দিলে বুনো মশার সঙ্গে বংশবিস্তারের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মেও ব্যাকটেরিয়া ছড়াতে পারে।

অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামে এ পদ্ধতিতে ডেঙ্গু সংক্রমণ ৬৯ থেকে ৯৬ শতাংশ পর্যন্ত কমার তথ্য রয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড মসকিটো প্রোগ্রামের যৌথ উদ্যোগে পরীক্ষামূলকভাবে পদ্ধতিটি চালুর পরিকল্পনা হয়েছে। আইসিডিডিআর,বি ও কীটতত্ত্ববিদেরা ঢাকার পরিবেশ উপযোগী ডব্লিউএএলবি২-ঢাকা স্ট্রেইন তৈরি করেছেন, যা ডেঙ্গু ছড়ানোর সক্ষমতা প্রায় ৯২ দশমিক ৭ শতাংশ কমাবে বলে আশা করছেন হালিমুর রশিদ।

প্রাথমিকভাবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় পাইলট প্রকল্প চালুর কথা রয়েছে। তবে পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন হবে, সেই বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য মেলেনি।

ডেঙ্গুর টিকা নিয়েও এখনই বড় কোনো সমাধানের আশা দেখছেন না হালিমুর রশিদ। তার মতে, অল্প কয়েকটি দেশে টিকা দেওয়া হলেও তা সর্বজনীন নয়। মুশতাক হোসেনও মনে করেন, পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকা ডেঙ্গুর টিকা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন ছাড়া প্রয়োগ করা ঠিক হবে না।

খ্যাতনামা চিকিৎসক মবিন খান বলেন, ডেঙ্গুর সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই; চিকিৎসা মূলত সহায়ক। তবে সময়মতো যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার এক শতাংশের নিচে রাখা সম্ভব।

তিনি জানান, গত বছর পর্যন্ত দেশে প্রধানত ডেঙ্গুর সেরোটাইপ-১ ও ২ ছড়িয়েছে। এবার সেরোটাইপ-৩ ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে।

একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে সাধারণত সেটির বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়, কিন্তু অন্য সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। ফলে আগে ডেঙ্গু হওয়া মানেই পরবর্তী সংক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকা নয়।

সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের সাফল্যের নজিরও রয়েছে। ১৯৯৩ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে কালাজ্বরে ব্যাপক প্রাণহানির পর সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় বিনামূল্যে লিপোসোমাল অ্যামফোটেরিসিন বি ইনজেকশন দেওয়া এবং ঘরের দেয়ালে কীটনাশক ছিটিয়ে বেলে মাছি ধ্বংসের উদ্যোগ নেয়। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম কালাজ্বর মুক্ত দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণেও ২০০৮ সাল থেকে ১৩টি ঝুঁকিপূর্ণ জেলায় কীটনাশকযুক্ত মশারি বিনামূল্যে বিতরণ, প্রত্যন্ত এলাকায় দ্রুত শনাক্তকরণ কিট পৌঁছে দেওয়া এবং আধুনিক ওষুধের আওতায় রোগীদের আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এসব পদক্ষেপের পর ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুহার ৯৬ শতাংশ কমেছে।

মুশতাকের মতে, আগের সাফল্যের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের নিবিড় কাজ, ধারাবাহিক নজরদারি এবং ঘরে ঘরে অভিযান। অর্থাৎ, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের সক্ষমতার নজির আছে। প্রশ্ন হলো, সেই অভিজ্ঞতা ডেঙ্গু ও হামের ক্ষেত্রে যথাযথভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে কি না।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad