যে ‘আপডেট এই ‘হ্যাকটোবরে’ সবচেয়ে বেশি দরকার

যে ‘আপডেট এই ‘হ্যাকটোবরে’ সবচেয়ে বেশি দরকার
Advertisement
Advertisement

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তিপ্রেমীদের কাছে অক্টোবর মাসটি ‘হ্যাকটোবর’ নামে পরিচিত। প্রতি বছর এই মাসে আমরা নতুন সব ঝুঁকি, নিত্যনতুন কৌশলে সেসব কাজে লাগানো এবং ডিজিটাল সিস্টেমের ত্রুটি দূর করার নানা আপডেট নিয়ে কথা বলি- যাতে কোনো আক্রমণকারী সেসব দুর্বলতার সুযোগ নিতে না পারে।

এসব আলোচনার বেশিরভাগই করপোরেট ও ফিনটেক খাতের ডিজিটাল সম্পদকে কেন্দ্র করে। কিন্তু আমাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ- আমাদের সন্তান এবং সাইবার জগতে তাদের নিরাপত্তার কথা নিয়ে কতটুকু  আমরা ভাবি?

এই হ্যাকটোবরে আমাদের একটু চিন্তা করা দরকার, সন্তানদের লালন-পালনে আমাদের অভ্যাসের কোন জায়গাগুলো এখনও পুরোনো ভার্সনেই রয়ে গেছে, হালনাগাদ কোথায় কোথায় করা উচিত। কারণ, আমাদের অজান্তেই নানা সাইবার ঝুঁকির মুখে আমাদের সন্তানরা আজ সঠিক দিক নির্দেশনার  অভাবে দিকভ্রান্ত।

এ সমস্যা মোকাবিলায় কোনো দামি এআই টুল কেনার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন নেই গালভরা নামের মনিটরিং সফটওয়্যার সাবস্ক্রাইব করা বা সাইবার নিরাপত্তার ওপর কোন ক্র্যাশ কোর্স করে ফেলা।

আমাদের সন্তানরা ইন্টারনেটে অপ্রত্যাশিত কিছুর মুখোমুখি কিংবা সহায়তার জন্য এআই টুলের শরণাপন্ন হবেই, তথ্য প্রযুক্তির যুগে এটাই স্বাভাবিক।

ইউনিসেফ পরিচালিত ২০১৯ সালের  এক জরিপ বলছে, বাংলাদেশে প্রতি চারজন শিশুর একজন ১১ বছর বয়সের আগেই ইন্টারনেট ব্যবহার শুরু করেছে। আর ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ৫৭ শতাংশই অচেনা মানুষের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট গ্রহণ করেছে।

একইভাবে ২০২৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১ হাজার ৬০ জন কিশোর-কিশোরীর ওপর ‘কমন্স সেন্স মিডিয়া’র করা এক জরিপ থেকে জানা যায়, তাদের ৭২ শতাংশই এআই টুল ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে প্রায় চার ভাগের এক ভাগ কিশোর-কিশোরী এআই বটের কাছে তাদের আসল নাম, অবস্থান বা ব্যক্তিগত গোপন তথ্য প্রকাশ করেছে। দেখা গেছে, তুলনামূলক কম বয়সী কিশোর-কিশোরীরা এসব পরামর্শতে বেশি আস্থা রাখছে। এই নিবন্ধটি লেখার সময় এ বিষয়ে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কোনো তথ্য না পেলেও, বিষয়টি নিয়ে আমাদের একটু ভেবে দেখা উচিত। অভিভাবক হিসেবে আমাদের নিজেদের ভেতরের জেনারেশন গ্যাপ বা মানসিক বয়সের ব্যবধান যত দ্রুত সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে, যেন সন্তানরা তাদের যেকোনো কথা নির্দ্বিধায় আমাদের সঙ্গে বন্ধুর মতন শেয়ার করতে পারে।

আরও পড়ুন

অস্ট্রেলিয়ার ‘ই-সেফটি কমিশন’-এর তথ্য অনুযায়ী, শিশুরা গড়ে ১৩ বছর বয়সেই প্রথম পর্নোগ্রাফির সংস্পর্শে আসে। তবে এই প্রথম অভিজ্ঞতাটি সাধারণত ঘটে অজ্ঞানতা বা অনিচ্ছাকৃত কারণে। আবার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউনিসেফ, ইকপ্যাট (ইসিপিএটি) এবং ইন্টারপোলের এক যৌথ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালেই ১১টি দেশের অন্তত ১২ লাখ শিশুর ছবি বিকৃত করে যৌন উসকানিমূলক ‘ডিপফেক’ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে।

বাংলাদেশে এ বিষয়ে সরাসরি কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও এর মূল বার্তাটি স্পষ্ট- কোনো অচেনা ব্যক্তি অনৈতিক কাজের প্রলোভন দেখানোর আগেই আমাদের সন্তানদেরকে নিজেদের রক্ষা করার কৌশল শেখাতে হবে। ডিভাইস কেড়ে নেওয়া বা ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়াকে প্রাথমিক দৃষ্টিতে সমাধান মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এটি শিশুকে পরবর্তী যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা পিতামাতার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখার জন্য উদ্বুদ্ধ করে।

স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার সংক্রান্ত এক গবেষণায় দেখা গেছে, পিতা-মাতা ও সন্তানের মাঝে  ভালো বোঝাপড়া সন্তানের মোবাইল আসক্তি কমায়- যা মূলত তাদের একাকীত্ব এবং বাস্তব থেকে পালিয়ে থাকার মানসিকতাকে দূর করে। অনেক সময় ফোন সমস্যাটির মূল কারণ নয়, বরং এটি  তাদের পালানোর একটি পথ মাত্র। একটি শিশু যখন নিজেকে একা, মানসিক চাপে জর্জরিত কিংবা অবহেলিত মনে করে, তখন ঘরে স্বস্তি না পেয়ে সে ডিভাইসের পর্দায়ই আশ্রয় খোঁজে।

আমাদের নিজেদের স্ক্রিন টাইমও এই সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ইন্দোনেশিয়ার কিশোর-কিশোরীদের ওপর চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, মা-বাবা যখন সন্তানকে উপেক্ষা করে নিজেরা ফোনে ব্যস্ত থাকেন (গবেষকদের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘Phubbing’), তখন সন্তানদের মধ্যেও ডিভাইসের ক্ষতিকর ব্যবহারের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়।

তাই আগে নিজেদের অভ্যাস সংশোধন করতে হবে এবং শিশুদের সঙ্গে আবেগীয় বন্ধন আরও সুদৃঢ় করতে হবে। সন্তান যখন কোনো অপ্রীতিকর বা অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার কথা খুলে বলবে, তখন অন্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে তাকে ধন্যবাদ জানানো এবং মনোযোগ দিয়ে তার কথা শোনা জরুরি।

পেন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, অভিভাবকদের কখনোই আড়ালে থেকে সন্তানদের ওপর নজরদারি চালানো উচিত নয়। গোপন নজরদারি সম্পর্কের পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট করে। তাই স্বচ্ছতাই এখানে মূল চাবিকাঠি। তারা কী দেখতে পারবে আর কোনটা পারবে না- তা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে বলতে হবে। এবং এটাও মনে রাখতে হবে, বাজারে থাকা বাণিজ্যিক কনটেন্ট ফিল্টার বা মনিটরিং টুলগুলো কখনোই সুস্থ ও স্বাভাবিক পারিবারিক সম্পর্কের বিকল্প হতে পারে না। তাই পরিবারের নিজস্ব মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে আনন্দদায়ক খেলার মতন করে কিছু নিয়ম তৈরি করা যেতে পারে। যেমন- কোনো অচেনা ব্যক্তি বা এআই চ্যাটবটের সঙ্গে নিজের গোপন তথ্য, অবস্থান বা ছবি কখনো শেয়ার না করা।

মনে রাখা দরকার, করপোরেট সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা অনলাইন কনটেন্টের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ খুবই সীমিত। আমরা সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারকদের কাছে আমাদের উদ্বেগের কথা পৌঁছাতে পারি, যাতে তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেন। তাছাড়া, যে সমাজ যেকোনো উপায়ে টাকা আর খ্যাতি অর্জনকে উৎসাহিত করে, কেবল আমাদের একক প্রচেষ্টায় তা রাতারাতি বদলে ফেলা সম্ভব নয়।

মার্শাল আর্ট যেমন আত্মরক্ষার কৌশল শেখায়, আমাদের উদ্যোগগুলোও শিশুদের ইন্টারনেটের তথ্যের মহাসমুদ্র ও এআই টুলের মধ্য থেকে প্রয়োজনীয় উত্তর খোঁজার পাশাপাশি নিজেদের সুরক্ষিত রাখার কৌশল শেখাবে। মার্শাল আর্টের মতই অপ্রয়োজনীয় কোনো রক্তপাত বা সংঘাত ছাড়াই তারা শিখবে কীভাবে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়।

অভিভাবক হিসেবে আমাদের নিজেদের যে ‘আপডেট’ প্রয়োজন, তার জন্য বাড়তি কোনো খরচের দরকার নেই। প্রয়োজন কেবল সন্তানদের সঙ্গে খোলা মনে, গভীর মমতায় দুটো কথা বলা।

লেখক: সাংবাদিক ও প্রযুক্তিবিদ

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad