ঝিনাইদহে বিসিআইসি সার ডিলার নিয়োগে নীতিমালা লঙ্ঘন, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। সার ডিলার বাছাইয়ে জেলা ও উপজেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির বিরুদ্ধে নীতিমালা স্পষ্টভাবে লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছেন অনেকেই। স্থানীয় বিএনপির বড় একটি অংশ দাবি করেছেন, মোটা অংকের আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে আওয়ামী লীগের পদধারী ও বিএনপি নেতাদের স্বজনদের ডিলার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে জেলা বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঝে দেখা দিয়েছে অসন্তোষ। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মাঝে দেখা দিয়েছে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া।
গত ৯ অক্টোবর দুপুরে কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে জেলায় নতুন ডিলারদের নিয়োগ সংক্রান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়। এরপরই জেলা জুড়ে বিএনপি নেতাকর্মী, প্রকৃত ব্যবসায়ী সহ সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। জেলা বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতাসহ জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত নবনিযুক্ত ডিলারদের তালিকা ও নিয়োগ সংক্রান্ত নীতিমালা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সার ডিলার নিয়োগের সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কোনো এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মরত শিক্ষক/কর্মচারী কিংবা সরকারি কর্মকর্তাদের নিকটাত্মীয় ডিলারশিপের অযোগ্য বলে গণ্য হবেন। অথচ হরিণাকুণ্ডু উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নে সালেহা বেগম মহিলা কলেজের এমপিওভুক্ত শিক্ষক আনিচুরের স্ত্রী আনোয়ারা নাসরিন ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। আনোয়ারা নাসরিনের মেয়ে সরকারি চাকরিজীবী, তিনি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত।
এছাড়া সদর উপজেলার পাগলাকানাই ইউনিয়নে ডিলারশিপ পাওয়া রাকিব হাসান বন্ধন ওরফে বন্ধন মিয়া নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের নির্বাহী কমিটির সদস্য। তিনিও পাগলাকানাই ইউনিয়নে ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছে।
হরিণাকুণ্ডুর চাঁদপুর ইউনিয়নে ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের কাছ থেকে ডিলারের আবেদনপত্র আহ্বান করা হয়। তবে ওই ওয়ার্ডের ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে আব্দুল লতিফ নামে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাকে। আব্দুল লতিফ জেলা বিএনপির সভাপতি এমএ মজিদের আপন বড় ভাই।
এ ছাড়া মহেশপুর উপজেলা উপজেলা যুবলীগের সভাপতির ভাই ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুজ্জামান মনার শ্যালক এহসান রেজা সারের ডিলার দিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। কালীগঞ্জ উপজেলার ত্রিলোচনপুর ইউনিয়নে জেলা বিএনপি সভাপতির শ্যালকের স্ত্রী সুরমা হাসান এবং শিমলা-রোকনপুর ইউনিয়নে জেলা বিএনপির সভাপতির চাচাতো শ্যালক নাজমুল হক মিশু ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। এসব ঘটনায় জেলা বিএনপির বড় একটি অংশের মাঝে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ তুলে মহেশপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দবির হোসেন উদ্দীন বিশ্বাস বলেন, ‘উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমার কাছে ৫ জন প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন। আমি সুনির্দিষ্ট নিরপেক্ষ তথ্য দিয়েছিলাম। কিন্তু জেলা পর্যায় থেকে সব নিয়ন্ত্রণ করার কারণে দলের ত্যাগী ব্যবসায়ী নেতারা বঞ্চিত হয়েছেন।’
স্বজনপ্রীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ অস্বীকার করে ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুজ্জামান মনা বলেন, ‘আমার শ্যালক জেলা বিএনপির দায়িত্বশীল পদে রয়েছে। তার পরিবারের অন্য কেউ আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত থাকলে থাকতে পারে। সার ডিলার নিয়োগ তো দলীয় বিবেচনায় দেয়াও হয়নি।’
জেলা বিএনপির সভাপতি এমএ মজিদ বলেন, ‘সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একক ভাবে কোনো ব্যক্তির কোনো কিছু করার সুযোগ নেই। একটি যাছাই-বাছাই কমিটি ছিল, সেই কমিটি সম্মিলিত ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে ডিলার নিয়োগের যোগ্য প্রার্থীদের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম বা দুর্নীতির কোনো সত্যতা নেই।’
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি মো. নোমান হোসেন ক্ষুদে বার্তায় জানান, ‘এখন পর্যন্ত মন্ত্রনালয় থেকে কোনো তালিকা আমরা হাতে পাইনি। তালিকা পাওয়ার পরে আমরা কথা বলতে পারব। কোনো বিষয়ে যদি কারো অভিযোগ থাকে, আমরা সেই অভিযোগ পেলে যথাযথ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবো।’
এর আগে, রোববার ডিলার নিয়োগে সরকার দলীয় প্রভাবশালীরা অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি করেছে বলে অভিযোগ তুলে প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছে জেলা জামায়াতে ইসলামী।


