ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাপরাধের ‘যৌক্তিক ভিত্তি’ পাওয়ার দাবি জাতিসংঘের

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাপরাধের ‘যৌক্তিক ভিত্তি’ পাওয়ার দাবি জাতিসংঘের
Advertisement
Advertisement

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে ‘যৌক্তিক ভিত্তি’ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের দাবি, ইরানে ফেব্রুয়ারিতে একটি প্রাথমিক স্কুল ও একটি ক্রীড়া স্থাপনায় চালানো দুটি সামরিক হামলার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র জড়িত থাকার বিষয়ে তাদের কাছে তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, হামলা দুটি আন্তর্জাতিক আইনে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনের সময় দেশটির কর্তৃপক্ষও মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ইরানবিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের নতুন এই প্রতিবেদনটি জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে জমা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এতে ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড এবং ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া দেশজুড়ে বিক্ষোভের বিরুদ্ধে ইরান সরকারের পদক্ষেপ- দুুই বিষয়ই খতিয়ে দেখা হয়েছে।

অবশ্য প্রতিবেদনটি নিয়ে পেন্টাগন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তারা এক বিবৃতিতে বলেছে, ইরানে যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে তদন্ত এখনো চলছে এবং এ মুহূর্তে তাদের ঘোষণা করার মতো কিছু নেই।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি অবশ্য জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের সমালোচনা করে বলেছেন, সংস্থাটি মানবাধিকারের ক্ষেত্রে কিছুই অর্জন করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতে কেবল ইরানই যুদ্ধাপরাধ করেছে বলে দাবি করেন তিনি।

জেনেভায় ইরানের স্থায়ী মিশনও এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধের তাৎক্ষণিক জবাব দেয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা এর আগে বলেছেন, তাদের সামরিক অভিযানগুলো যুদ্ধ নীতি অনুযায়ী পরিচালিত হয়। অন্যদিকে, ইরানও ধারাবাহিকভাবে দেশটির বিরুদ্ধে পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনগুলো কোনো বিচারিক সংস্থা নয়। তাই তারা সরাসরি কোনো ফৌজদারি মামলা শুরু করতে পারে না। তবে তাদের তদন্ত ও অনুসন্ধানের তথ্য জাতীয় আদালত কিংবা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিজে) মতো আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের ফৌজদারি তদন্তে ব্যবহার করা যেতে পারে। সোমবার জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের বৈঠকে রাষ্ট্রগুলো এই প্রতিবেদনের তথ্য বা অনুসন্ধান নিয়ে আলোচনা করবে।

মিশনের প্রতিবেদনে ইরানের মিনাব শহরের শাজারেহ তাইয়েবেহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীই ওই হামলার জন্য দায়ী- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো যুক্তিসংগত ভিত্তি তারা পেয়েছেন।

আরও পড়ুন

ইরানি কর্মকর্তাদের হিসাবে, হামলায় ১৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। নিহতদের মধ্যে প্রায় ১২০ জন ছিল স্কুলশিশু। জাতিসংঘের মিশনের মতে, ওই নির্বিচার হামলায় বেসামরিক মানুষ বিশেষ করে শিশুর মৃত্যু ও বেসামরিক অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় এটি যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্কুলটি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড করপসের (আইআরজিসি) নৌ-স্থাপনার পাশে ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হামলার লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্কুলটির বিষয়ে তথ্য হালনাগাদ না করা এবং ভবনটি সামরিক লক্ষ্যবস্তু কি না, তা নিশ্চিত না করাকে শুধু সাধারণ অবহেলা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করে জাতিসংঘ মিশন।

আরও পড়ুন: ইসরায়েলি হামলায় ইরানের স্কুলে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১8৮

সংস্থাটির বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী স্কুল ভবনটিকেই লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল এবং তারা জানত যে বেসামরিক স্থাপনায় আঘাত হানার যথেষ্ট ঝুঁকি রয়েছে। তবুও হামলার সম্ভাব্য পরিণতির বিষয়ে তারা বেপরোয়া আচরণ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জুনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ফেব্রুয়ারিতে ইরানে স্কুলে ‘কেউই’ ইচ্ছাকৃতভাবে হামলা চালায়নি। তিনি এ বক্তব্যের পক্ষে পেন্টাগনের একটি তদন্তের কথা উল্লেখ করেছিলেন।

এর আগে রয়টার্স জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রাথমিক অভ্যন্তরীণ তদন্তে ধারণা করা হয়েছিল-দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরে প্রাণঘাতী ওই হামলার জন্য মার্কিন বাহিনী সম্ভবত দায়ী। পরে পেন্টাগন ওই তদন্তের পরিধি বাড়িয়েছে। তবে এখনো তদন্তের কোনো প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, স্কুলটি স্পষ্টভাবে শনাক্তযোগ্য একটি বেসামরিক স্থাপনা ছিল এবং সেটি সামরিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল- এমন কোনো প্রমাণ তারা পাননি। একই সময়ে লামের্দ শহরের একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্সের ওপর হামলার ঘটনাতেও জাতিসংঘের মিশন প্রায় একই ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলায় আশপাশের আবাসিক ভবন ও একটি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ২২ জন বেসামরিক মানুষ হতাহত হন। মিশনের মতে, ওই হামলাটিও ছিল নির্বিচার এবং সে কারণে এটিও যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।

তবে ওই ঘটনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড মার্চে এক বিবৃতিতে দাবি করেছিল, ওই দিন মার্কিন বাহিনী লামের্দ শহরে কোনো হামলা চালায়নি।

ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়েও প্রতিবেদনে গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে। জাতিসংঘের মিশনের তদন্তে বলা হয়েছে, গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় ইরানি কর্তৃপক্ষ বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে ব্যাপক ও পরিকল্পিত ধরনের দমন অভিযান চালিয়েছে। এই অভিযানের মধ্যে বেআইনি হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, ইচ্ছামতো গ্রেপ্তার ও আটক, জোরপূর্বক গুম এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর কঠোর বিধিনিষেধের মতো কর্মকাণ্ড ছিল। তাদের মতে, এসব কর্মকাণ্ড মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর শিয়া মুসলিম ধর্মীয় নেতারা ক্ষমতায় আসার পর এটিই ছিল ইরানের জনগণের ওপর সরকারপক্ষের সবচেয়ে বড় দমন-পীড়নগুলোর একটি। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলেছে, নিহতদের মধ্যে বিক্ষোভে সরাসরি অংশ না নেওয়া পথচারীরাও ছিলেন।

তেহরান অবশ্য বিক্ষোভের জন্য ‘সন্ত্রাসী ও দাঙ্গাকারীদের’ দায়ী করেছে। ইরান সরকারের দাবি, নির্বাসিত বিরোধীরা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মতো বিদেশি শক্তির সমর্থনে এসব কর্মকাণ্ড হয়েছে।

বিক্ষোভে নিহতের মোট সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি জাতিসংঘের মিশন। তবে তারা মনে করে, সরকারি হিসাবে যে সংখ্যক মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন, প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা তিন হাজার ৩৮ জন এবং আহত হয়েছেন ২৫ হাজার মানুষ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটিতে আগে ভিন্নমত দমনের যে পদ্ধতি দেখা গেছে সে তুলনায় এবারের বিক্ষোভ মোকাবিলায় ইরান সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের মধ্যে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড, ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া এবং মৃত্যুদণ্ড অনেক বেশি মাত্রায় ব্যবহার হয়েছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad