নেপালে বন্যার নয় দিন পর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে জীবিত অবস্থায় দুই শ্রমিককে উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার ত্রিশূলী-থ্রিএ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে চলমান উদ্ধার অভিযানে তাদের বের করে আনেন উদ্ধারকারীরা।
নেপালের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রাজা রাম বাসনেত প্রথম শ্রমিককে উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করার কিছুক্ষণ পর দেশটির আইনপ্রণেতা শ্রী রাম নেউপানে তার ফেসবুক পেজে দ্বিতীয় শ্রমিককে উদ্ধারের খবর জানান।
স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, প্রথম উদ্ধার হওয়া শ্রমিকের শরীর কাদায় ঢেকে আছে। একজন উদ্ধারকারী তাকে কাঁধে করে ঘটনাস্থল থেকে বের করে আনছেন। পরে ঘটনাস্থলেই একটি চিকিৎসক দল তার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করে।
ত্রিশূলী-থ্রিএ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে আটকে পড়া শ্রমিকদের সন্ধানে কয়েক দিন ধরে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান চলছে। ঘন কাদা, পাথর ও বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষের কারণে উদ্ধারকারীদের কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা অন্য সুড়ঙ্গগুলোতে আটকে থাকা শ্রমিকদের উদ্ধারের আশাও বাড়িয়েছে।
এর আগে নেপালের রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির আইনপ্রণেতা শ্রী রাম নেউপানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, ত্রিশূলী-থ্রিএ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে মানুষের কথা বলার শব্দ শুনেছেন উদ্ধারকারীরা। খবর পাওয়ার পর নেপালি সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা সুড়ঙ্গে প্রবেশ করে উদ্ধার অভিযান জোরদার করেন।
নেউপানে লেখেন, উদ্ধারকারী দল নেপালি সেনাবাহিনীর কাছ থেকে জানতে পেরেছে যে সুড়ঙ্গের ভেতর মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা গেছে। পরে তিনি জানান, একাধিক ব্যক্তির কণ্ঠস্বর শোনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উদ্ধারকারীরা।
উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গের ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের উদ্দেশে বলেন, ‘আতঙ্কিত হবেন না, আমরা আপনাদের উদ্ধার করতে এসেছি।’ ভেতর থেকে ‘ঠিক আছে’ বলে সাড়া পাওয়া যায় বলে নেউপানে জানান। তার মতে, আটকে পড়া শ্রমিকদের কথা বলার শব্দ পাওয়া উদ্ধার তৎপরতার জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক খবর।
এদিকে নেপালের রাসুয়াগাধি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পেও আটকে থাকা কয়েক ডজন শ্রমিককে জীবিত উদ্ধারের ব্যাপারে আশাবাদী কর্তৃপক্ষ। নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির বোর্ড সদস্য আমশু কিরণ শাহি জানান, ওই প্রকল্পের একটি কক্ষের মতো স্থানে প্রায় ৪৬ জন আটকে থাকতে পারেন।
শাহি বলেন, সেখানে শ্রমিকদের এক সপ্তাহ ধরে বেঁচে থাকার মতো খাবার ও পানি থাকার কারণে তারা জীবিত আছেন বলে তারা ‘খুবই আত্মবিশ্বাসী’। ওই কক্ষে পৌঁছানোর মতো একটি সুড়ঙ্গ রয়েছে এবং উদ্ধারকারীরা সেখানে প্রবেশের চেষ্টা করছেন।
চীনের সীমান্তের কাছে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট নজিরবিহীন বন্যায় নেপালের বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতে বিভিন্ন এলাকা ভেসে যায়। এখন পর্যন্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো থেকে ২৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে আরও অন্তত ৬৩৯ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
১১১ মেগাওয়াট ক্ষমতার রাসুয়াগাধি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি চীনের সীমান্ত থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে রাসুয়া জেলার একটি দুর্গম পাহাড়ি উপত্যকায় অবস্থিত। গত বুধবারের বন্যার পর সেখানে ভূগর্ভস্থ একটি কক্ষে বহু শ্রমিক আটকা পড়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নেপাল সেনাবাহিনী, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী এবং ভারত ও চীনের উদ্ধারকারী দলগুলো নিখোঁজদের সন্ধানে কাজ করছে। উদ্ধার অভিযানে ভারতীয়, চীনা ও কোরীয় বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার বিশেষজ্ঞদেরও সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটির কর্মকর্তা শাহি জানান, ত্রিশূলী-থ্রিএ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে ঘন কাদার কারণে সুড়ঙ্গের অবস্থান শনাক্ত করতেই উদ্ধারকারীদের প্রায় ছয় দিন সময় লেগেছে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই দুর্যোগে অন্তত ২২ লাখ টন ধ্বংসাবশেষ জমেছে। এর মধ্যে ভবনের ধ্বংসাবশেষ, পাথর ও পলিও রয়েছে।
গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তের আকস্মিক বন্যায় এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২৫২ জন নিহত হয়েছেন। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় সাড়ে ৪ হাজার মানুষ।


