জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে গত ১৯ কর্মদিবসে ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে রক্ত পরীক্ষা করা ৪৮০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪৯ জনের শরীরে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। এ অবস্থায় মশকনিধনে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি ও নিয়মিত মশার ওষুধ না ছিটানোর অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারের প্যাথলজি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ১৯ কর্মদিবসে ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য ৪৮০ জন শিক্ষার্থী রক্তের নমুনা দেন। পরীক্ষায় তাদের মধ্যে ৪৯ জনের ফলাফল পজিটিভ আসে।
ডেঙ্গু আক্রান্ত কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, জ্বর, মাথাব্যথা ও শরীর ব্যথাসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর তারা মেডিকেল সেন্টারে পরীক্ষা করান। পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর কেউ হলে থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছেন, আবার কেউ বাড়িতে ফিরে গেছেন। একই সময়ে আবাসিক হলগুলোর একাধিক শিক্ষার্থী আক্রান্ত হওয়ায় অন্যদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু মশা নিধনের প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভর না করে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে গুরুত্ব দিতে হবে। মানুষের বসতবাড়ি ও আশপাশে থাকা পানির ড্রাম, টিন কিংবা বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার ঘটে। তাই উন্মুক্ত স্থানে ফগিং করে শুধু পূর্ণবয়স্ক মশা নিধন করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি প্রজননস্থল চিহ্নিত করে নিয়মিত ধ্বংস করা এবং এন্টোমোলজিক্যাল সার্ভেইল্যান্স বা মশা জরিপ চালু করা প্রয়োজন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জাকসু) স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক হোসনে মোবারক বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। ক্যাম্পাসে জমে থাকা পানি ও এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল দ্রুত পরিষ্কারের বিষয়ে হল প্রভোস্ট ও এস্টেট অফিসের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে প্রচারণাও চালানো হচ্ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর বলেন, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও সুযোগ-সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে ক্যাম্পাস পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার দাবি জানানো হয়েছে। মশার লার্ভা জন্মানোর স্থানগুলো ধ্বংসের পাশাপাশি ফগার মেশিন ব্যবহার করে মশার প্রকোপ কমানোর জন্যও প্রশাসনের কাছে দাবি জানানো হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা মো. শামছুল আলম বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। সামনের দিনগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু ওষুধ ছিটানো যথেষ্ট নয়; ক্যাম্পাসের অপ্রয়োজনীয় ঝোপঝাড়, জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা ও অন্যান্য সম্ভাব্য প্রজননস্থল দ্রুত পরিষ্কার করা দরকার।
এস্টেট অফিসের ডেপুটি রেজিস্ট্রার আবদুর রহমান বলেন, মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত, অন্তত সপ্তাহে একবার, স্প্রে করা প্রয়োজন। তবে ক্যাম্পাসে সর্বশেষ জুন মাসে মশকনিধনের ওষুধ ছিটানো হয়েছে। নতুন মশকনিধন সামগ্রী কেনার জন্য গত জুলাইয়ে বাজেট চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে বরাদ্দ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করে স্প্রে কার্যক্রম শুরু করা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মুহম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে দ্রুত করণীয় নির্ধারণে আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে মেডিকেল সেন্টারের উপদেষ্টা পরিষদ ও মশকনিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।


