এক বছর আগে, যখন ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’-এর ছাপা সংস্করণের যাত্রা শুরু হয়, তখন সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।
এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে চলা একদলীয় শাসনের অবসান হয় ও দেশে গণতন্ত্র ফেরানো, মুক্তভাবে কথা বলা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার নতুন সুযোগ তৈরি হয়। সাংবাদিকদের জন্য এটি ছিল রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব, আপসকামিতা ও দাসত্বসুলভ মনোভাব থেকে বেরিয়ে নতুন করে শুরু করার একটি বড় সুযোগ। কারণ, অতীতের ওই চর্চা সাংবাদিকতা পেশার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ভীষণভাবে নষ্ট করেছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সেই সুযোগকে বাস্তবে কাজে লাগানো যায়নি।
বাংলাদেশে গণমাধ্যমের ভেতরে নৈতিকতার মারাত্মক পতন ঘটেছে। বছরের পর বছর ধরে সংবাদমাধ্যমের একটি বড় অংশ নিজেদের স্বাধীনতাকে রাজনৈতিক ও আর্থিক স্বার্থের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল। অনেক মালিক, সম্পাদক ও সাংবাদিক প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন এবং সরকারের অনুগত সমর্থক হিসেবে কাজ করেছেন। সাংবাদিকতার মূল কাজই হলো ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির মুখোমুখি করা, কিন্তু তারা সেই দায়িত্ব একপাশে সরিয়ে রেখেছিলেন।
তবে সরকার পতনের পর দেখা গেল আরেকটি অবাক করা দৃশ্য। যেসব সাংবাদিক এতদিন সরকারের তোষামোদি ও প্রশংসা করেছেন, তারাই রাতারাতি সেই সরকারের সবচেয়ে বড় সমালোচক হয়ে উঠলেন। এই পরিবর্তন তাদের সুযোগসন্ধানী চরিত্রকে প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে–তারা আদর্শের নয়, ক্ষমতার পেছনে ছোটেন।
হাসিনা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে এক অভাবনীয় তোলপাড় দেখা দিয়েছে। অনেক সংবাদ প্রতিষ্ঠানে সম্পাদনার মূল পদে একদল সাংবাদিককে সরিয়ে আরেকদলকে বসানো হয়েছে। নতুন করে দায়িত্ব পাওয়া অধিকাংশ সাংবাদিকের সঙ্গেই বর্তমান সরকারি বা বিরোধী দলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগাযোগ রয়েছে। ফলে কেবল এক দলের পক্ষপাতিত্ব বাদ দিয়ে অন্য দলের পক্ষপাতিত্ব শুরু হয়েছে।
এর ফলে বাংলাদেশে সত্যিকারের স্বাধীন, নির্ভীক ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার এক বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। কয়েকটি সংবাদ মাধ্যম এই অভাব পূরণের চেষ্টা করছে সত্যি, তবে ব্যবধানটা এখনো অনেক বড়। রাজনীতি, ব্যবসা ও ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সাংবাদিকতা করার যে আশা সাধারণ মানুষের ছিল, তা অপূর্ণই রয়ে গেছে। টাইমস সেই খালি জায়গাটি পূরণ করতেই মাঠে নেমেছে।
২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর আমাদের ছাপা সংস্করণ শুরুর পর থেকে আমরা একটি সাধারণ নীতি মেনে চলার চেষ্টা করেছি: সাংবাদিকতায় কোনো আপস নয়। আমরা এমন সব খবর, ব্যঙ্গচিত্র (কার্টুন) ও বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছি, যা ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সবসময় ভালোভাবে নেননি। কিন্তু আমাদের সব খবর ছিল বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যভিত্তিক, আর আমরা আমাদের প্রকাশিত খবরের পক্ষে অনড় থেকেছি।
নানা সময় আমাদের কাছে অনুরোধ ও আপত্তি এসেছে। দায়িত্বশীল সাংবাদিক হিসেবে আমরা তাদের কথা শুনেছি, কিন্তু কেবল কোনো ক্ষমতাধর ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অস্বস্তিতে পড়েছেন বলেই আমরা আমাদের অবস্থান বদলাইনি।
আমাদের সম্পাদনা নীতি খুব পরিষ্কার। আমরা একবার প্রকাশিত কোনো খবর সরিয়ে বা মুছে ফেলি না। তবে জবাবদিহিতার ব্যাপারে আমরা শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কেউ যদি প্রমাণ করতে পারেন, যে আমাদের কোনো খবর তথ্যের দিক থেকে ভুল ছিল, তবে আমরা তা সংশোধন করব এবং প্রয়োজন হলে ক্ষমা চেয়ে তা প্রত্যাহার করে নেব।
গত এক বছরে আমরা আধুনিক নকশা, দৃশ্যমান ছবি ও চমৎকার উপায়ে তথ্য তুলে ধরার নিজস্ব কিছু পদ্ধতি তৈরি করেছি। আমাদের এই চেষ্টা পাঠকদের মন ছুঁয়েছে। সমাজের বিভিন্ন স্তরের পাঠকের পাশাপাশি সহকর্মী সাংবাদিকদের কাছ থেকেও আমরা দারুণ সাড়া পেয়েছি।
আমাদের এই অভিজ্ঞতা একটি সাধারণ সত্যকে আবার প্রমাণ করেছে, কোনো সংবাদ প্রতিষ্ঠান যখন অন্য সব স্বার্থের চেয়ে সাংবাদিকতাকে আগে রাখে, মানুষ তা ঠিকই বুঝতে পারে এবং বিশ্বাস করতে শুরু করে। যে দেশে রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপের কারণে স্বাধীনভাবে কাজ করা অত্যন্ত কঠিন, সেখানে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করা সহজ কথা নয়।
টাইমস-এর যেসব সাংবাদিক ও সহকর্মী চরম নিষ্ঠা, সাহস ও সততার সঙ্গে কাজ করে এই যাত্রাকে সফল করেছেন আমি তাদের সবার কাছে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।
টাইমস যত সামনের দিকে এগোচ্ছে, আমাদের লক্ষ্য কেবল একটি পত্রিকা হিসেবে বড় হওয়া নয়, বরং সাংবাদিকতার মানকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাওয়া—আরও গভীরভাবে সত্যের খোঁজ করা, আরও নির্ভয়ে প্রশ্ন তোলা, আরও সুন্দরভাবে খবর উপস্থাপন করা এবং তথ্য ও জনস্বার্থের প্রশ্নে কোনো আপস না করা।
আমাদের ওপর বিশ্বাস রাখার জন্য এবং পুরো বছরজুড়ে পাশে থাকার জন্য আমি আমাদের সম্মানিত পাঠক, শুভানুধ্যায়ী, পৃষ্ঠপোষক ও বিজ্ঞাপনদাতাদের আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।


